বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর লাশ চুরি ও ইহুদী চক্রান্ত

হিজরী ৫৫৭ সালের একরাতের ঘটনা। সুলতান নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) তাহাজ্জুদ ও দীর্ঘ মুনাজাতের পর ঘুমিয়ে পড়েছেন। চারিদিক নিরব নিস্তব্দ। কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। এমতাবস্থায় হঠাৎ তিনি স্বপ্নে দেখলেন স্বয়ং রাসুল (স) তার কামরায় উপস্থিত। তিনি কোন ভূমিকা ছাড়াই দু’জন নীল চক্ষু বিশিষ্ট লোকের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, (নূরুদ্দীন) মাহমূদ! (এরা আমাকে বিরক্ত করছে), এ দুজন থেকে আমাকে মুক্ত কর।

এই ভয়াবহ স্বপ্ন দেখে নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গোটা কক্ষময় পায়চারি করতে লাগলেন। সাথে সাথে তার মাথায় বিভিন্ন প্রকার চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। হৃদয় রাজ্যে ভীড় জমাল হাজারও রকমের প্রশ্ন। তিনি ভাবলেন-

আল্লাহর রাসূল তো এখন কবরে জীবনে!

তার সাথে অভিশপ্ত ইহুদীরা এমন কী ষড়যন্ত্র করতে পারে?

কী হতে পারে তাদের চক্রান্তের স্বরুপ?

তারা কি রাসূল (স)-এর কোন ক্ষতি করতে চায়?

চায় কি পর জীবনেও তার সাথে ষড়যন্ত্র লিপ্ত হতে?

আমাকে দু’জন ইহুদীর চেহারা দেখানো হল কেন?

শয়তান তো আল্লাহর নবীর অবয়বে আসতে পারে না। তাহলে কি আমি সত্য স্বপ্ন দেখেছি?

এসব ভাবতে ভাবতে সুলতান অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি অজু-গোসল সেরে তাড়াতাড়ি দু’রাকাত নামায আদায় করলেন। তারপর মহান আল্লাহর দরবারে ক্রন্দনরত অবস্থায় অনেকক্ষণ মুনাজাত করলেন। সুলতানের এমন কেউ ছিল না যার সাথে তিনি পরামর্শ করবেন। আবার এ স্বপ্নও এমন নয় যে, যার তার কাছে ব্যক্ত করবেন। অবশেষে আবারও তিনি শয়ন করলেন। দীর্ঘ সময় পর যখনই তার একটু ঘুমের ভাব এলো, সঙ্গে সঙ্গে এবারও তিনি প্রথম বারের ন্যায় নবী করীম (সা)কে স্বপ্নে দেখলেন। তিনি তাকে পূর্বের ন্যায় বলছেন, (নূরুদ্দীন) মাহমূদ! এ দুজন থেকে আমাকে মুক্ত কর।

এবার নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) “আল্লাহ্, আল্লাহ্” বলতে বলতে বিছানা থেকে উঠে বসলেন। তারপর কোথায় যাবেন, কী করবেন কিছুই ঠিক করতে পা পেরে দ্রুত অজু-গোসল শেষ করে মুসল্লায় দাড়িয়ে অত্যধিক ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় দু’রাকাত নামায আদায় করলেন এবং দীর্ঘ সময় অশ্রু সিক্ত নয়নে দোয়া করলেন।

রাতের অনেক অংশ এখনও বাকী। সমগ্র পৃথিবী যেন কি এক বিপদের সম্মুখীন হয়ে নিঝুম হয়ে আছে। কী এক মহা বিপর্যয় যেন পৃথিবীর বুকে সংঘটিত হতে যাচ্ছে । কঠিন বিপদের ঘনঘটা যেন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি মুখ তুলে আকাশ পানে তাকালেন। মনে হলো স্বপ্ন দেখা ঐ দু’জন লোক যেন তাকে ধরার জন্য দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসছে। তিনি সেই চেহারা দুটোকে মনের মনিকোষ্ঠা থেকে সরাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই তা সম্ভব হল না। শেষ পর্যন্তু নিরুপায় হয়ে নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) চোখ বন্ধ করে আবারও তন্দ্রা-বিভোর হয়ে শুয়ে পড়লেন।

শোয়ার পর তৃতীয়বারও তিনি একই ধরনের স্বপ্ন দেখলেন। রাসূল (সা)-এর বক্তব্য শেষ হওয়ার পর নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) ক্রন্দনরত অবস্থায় বিছানা পরিত্যাগ করলেন। এবার তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে, নিশ্চয়ই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারক কোন না মহাবিপদের সম্মুখীন হয়েছে।

তিনি তড়িৎ গতিতে অজু-গোসল করে ফজরের নামায আদায় করলেন। নামায শেষে প্রধানমন্ত্রী জালালুদ্দীন মৌশুলীর নিকট গিয়ে গোপনীয়তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে স্বপ্নের বিবরণ শুনালেন এবং এ মুহূর্তে কী করা যায়, এ ব্যাপারে সুচিন্তিত পরামর্শ চাইলেন।

জালালুদ্দীন মৌশুলী স্বপ্নের বৃত্তান্ত অবগত হয়ে বললে, “হুজুর! আপনি এখনও বসে আছেন? নিশ্চয়ই প্রিয় নবীর রওজা মোবারক কোন কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। তাই এ বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য বারবার তিনি আপনাকে স্মরণ করছেন। অতএব, আমার পরামর্শ হল, সময় নষ্ট না করে অতিসত্তর মদীনার পথে অগ্রসর হোন।” নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) আর কালবিলম্ব করলেন না। তিনি ষোল হাজার দ্রুতগামী অশ্রারোহী সৈন্য এবং বিপুল ধন সম্পদ নিয়ে বাগদাদ থেকে মদিনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। রাত দিন সফর করে ১৭তম দিনে মদিনা শরীফে পৌঁছলেন এবং সৈন্য বাহিনীসহ গোছল ও অজু সেরে দু’ রাকাত নফল নামাজান্তে দীর্ঘ সময় ধরে মোনাজাত করলেন। তারপর সৈন্য বাহিনী দ্বারা মদিনা ঘেরাও করে ফেললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আদেশ জারী করে দিলেন যে, বাইরের লোক মদিনায় আসতে পারবে, কিন্তু সাবধান! মদিনা থেকে কোন লোক বাইরে যেতে পারবে না।

নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) জুম্মার খোৎবা দান করলেন এবং ঘোষণা দিলেন, “আমি মদিনাবাসীকে দাওয়াত দিয়ে এক বেলা খানা খাওয়াতে চাই। আমার অভিলাষ, সকলেই যেন এই দাওয়াতে অংশ গ্রহণ করে।” সুলতান মদিনাবাসীকে আপ্যায়নের জন্য বিশাল আয়োজন করলেন এবং প্রত্যেকের নিকট অনুরোধ করলেন, মদিনার কোন লোক যেন এই দাওয়াত থেকে বঞ্চিত না হয়। নির্ধারিত সময়ে খাওয়া-দাওয়া শুরু হল। প্রত্যেকেই তৃপ্তিসহকারে খানা খেল। যারা দুরদুরান্ত থেকে আসতে পারেনি তাদেরকেও শেষ পর্যন্ত ঘোড়া ও গাধার পিঠে চড়িয়ে আনা হল। এভাবে প্রায় পনের দিন পর্যন্ত অগনিত লোক শাহী দাওয়াতে শরিক হওয়ার পর সুলতান জিজ্ঞাসা করলেন আরও কেউ অবশিষ্ট আছে কি? থাকলে তাদেরকেও ডেকে আন।

এই নির্দেশের পর সুলতান বিশ্বস্ত সূত্রে অবগত হলেন যে, আর কোন লোক দাওয়াতে আসতে বাকী নেই। একথা শুনে তিনি সীমাহীন অস্থির হয়ে পড়লেন। চিন্তার অথৈই সাগরে হারিয়ে গেলেন তিনি। ভাবলেন, যদি আর কোন লোক দাওয়াতে শরীক হতে বাকী না থাকে তাহলে সেই অভিশপ্ত লোক দু’জন গেল কোথায়? আমি তো দাওয়াতে শরীক হওয়া প্রতিটি লোককেই অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। কিন্তু কারও চেহারাইতো স্বপ্নে দেখা লোক দুটোর চেহারার সাথে মিলল না, তাহলে কি আমার মিশন ব্যর্থ হবে? আমি কি ঐ কুচক্রী লোক দুটোকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দিতে সক্ষম হব না? এসব চিন্তায় বেশ কিছুক্ষণ তিনি ডুবে রইলেন। তারপর আবারও তিনি নতুন করে ঘোষণা করলেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মদিনার সকল লোকদের দাওয়াত খাওয়া এখনও শেষ হয়নি। অতএব সবাইকে আবারও অনুরোধ করা যাচ্ছে, যারা এখনও আসেনি তাদেরকে যেন অনুসন্ধান করে দাওয়াতে শরীক করা হয়।

একথা শ্রবণে মদিনাবাসী সকলেই এক বাক্যে বলে উঠল, “হুজুর! মদিনার আশে পাশে এমন কোন লোক বাকী নেই, যারা আপনার দাওয়াতে অংশ গ্রহণ করেনি।” তখন নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) বলিষ্ঠ কন্ঠে বললেন, “আমি যা বলেছি, ঠিকই বলেছি। আপনারা ভাল ভাবে অনুসন্ধান করুন।” সুলতানের এই দৃঢ়তা দেখে লক্ষাধিক জনতার মধ্য থেকে এক ব্যক্তি হঠাৎ করে বলে উঠল, “হুজুর! আমার জানামতে দু’জন লোক সম্ভবত এখনও বাকী আছে। তারা আল্লাহ্‌ওয়ালা বুযুর্গ মানুষ। জীবনে কখনও কারও কাছ থেকে হাদীয়া তোহফা গ্রহণ করেন না, এমনকি কারও দাওয়াতেও শরীক হন না। তারা নিজেরাই লোকদেরকে অনেক দান-খয়রাত করে থাকেন। নীরবতাই অধিক পছন্দ করেন। লোক সমাজে উপস্থিত হওয়া মোটেও ভালবাসেন না।”

লোকটির বক্তব্য শুনে সুলতানের চেহারায় একটি বিদ্যুত চমক খেলে গেল। তিনি কাল বিলম্ব না করে কয়েকজন লোক সহকারে ঐ লোক দুটোর আবাসস্থলে উপস্থিত হলেন। তিনি দেখলেন, এতো সেই দু’জন, যাদেরকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছিল। তাদেরকে দেখে সুলতানের দু’চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কে তোমরা? কোথা থেকে এসেছ? তোমরা সুলতানের দাওয়াতে শরীক হলে না কেন?”

লোক দুটো নিজের পরিচয় গোপন করে বলল, “আমরা মুসাফির। হজ্বের উদ্দেশ্য এসেছিলাম। হজ্ব কার্য সমাধা করে জিয়ারতের নিয়তে রওজা শরীকে এসেছি। কিন্তু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেমে আত্মহারা হয়ে ফিরে যেতে মনে চাইল না। তাই বাকী জীবন রওজার পাশে কাটিয়ে দেওয়ার নিয়তেই এখানে রয়ে গেছি। আমরা কারও দাওয়াত গ্রহণ করি না। এক আল্লাহর উপরই আমাদের পূর্ণ আস্থা। আমরা তারই উপর নির্ভরশীল। এবাদত, রিয়াজত ও পরকালের চিন্তায় বিভোর থাকাই আমাদের কাজ। কুরআন পাক তিলাওয়াত, নফল নামায ও অজিফা পাঠেই আমাদের সময় শেষ হয়ে যায়। সুতরাং দাওয়াত খাওয়ার সময়টা কোথায়?”

উপস্থিত জনগণ তাদের পক্ষ হয়ে বলল যে, “হুজুর! এরা দীর্ঘদিন যাবত এখানে অবস্থান করছে। এদের মত ভাল লোক আর হয় না। সব সময় দরিদ্র, এতিম ও অসহায় লোকদের প্রচুর পরিমাণে সাহায্য করে। তাদের দানের উপর অত্র লোকদের প্রচুর পরিমাণে জীবিকা নির্ভর করে।” নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) লোকদের কথা শুনে লোক দুটোর প্রতি পুনরায় গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে তাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলেন। এতে আবারও তিনি নিশ্চিত হলেন, এরা তারাই যাদেরকে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন।

এবার সুলতান জলদ গম্ভীর স্বরে তাদেরকে বললেন, “সত্য কথা বল। তোমরা কে? কেন, কী উদ্দেশ্যে এখানে থাকছ?”

এবারও তারা পূর্বের কথা পুনরাবৃত্তি করে বলল, “আমরা পশ্চিম দেশ থেকে পবিত্র হজ্বব্রত পালনের জন্য এখানে এসেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নৈকট্য লাভই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যেই আমরা এখানে অবস্থান করছি।” সুলতান এবার কারও কথায় কান না দিয়ে তাদেরকে সেখানে আটক রাখার নির্দেশ দিলেন, অত:পর স্বয়ং তাদের থাকার জায়গায় গিয়ে খুব ভাল করে অনুসন্ধাণ চালালেন। সেখানে অনেক মাল সম্পদ পাওয়া গেল। পাওয়া গেল বহু দুর্লভ কিতাবপত্র। কিন্তু এমন কোন জিনিষ পাওয়া গেল না, যা দ্বারা স্বপ্নের বিষয়ে কোন প্রকার সহায়তা হয়।

নূরুদ্দীন জাঙ্কি(র:) অত্যধিক পেরেশান, অস্থির। এখনও রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় তিনি সীমাহীন চিন্তিত। এদিকে মদীনায় বহু লোক তাদের জন্য সুপারিশ করছে। তারা আবারও বলছে, “হুজুর! এরা নেককার বুযুর্গ লোক। দিনভর রোজা রাখেন। রাতের অধিকাংশ সময় ইবাদত বন্দেগীতে কাটিয়ে দেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযই রওজা শরীফের নিকটে এসে আদায় করেন। প্রতিদিন নিয়মিত জান্নাতুল বাকী যিয়ারত করতে যান। প্রতি শনিবার মসজিদুল কোবাতে গমন করেন। কেউ কিছু চাইলে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না।”

সুলতান তাদের অবস্থা শুনে সীমাহীন আশ্চর্যবোধ করলেন। তথাপি তিনি হাল ছাড়ছেন না। কক্ষের অংশে অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফিরিয়ে যাচ্ছেন। ঘরের প্রতিটি বস্তুকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কিন্তু সন্দেহ করার মত কিছুই তিনি পাচ্ছেন না।

নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) এক পর্যায়ে সঙ্গীদের বললেন- “আচ্ছা, তাদের নামাযের মুসাল্লাটা একটু উঠাও দেখি।” সঙ্গীরা নির্দেশ পালন করল। নামাযের মুসল্লাটি বিছানো ছিল একটি চাটাইয়ের উপর। সুলতান আবার নির্দেশ দিলেন, “চাটাইটিও সরিয়ে ফেল।”

চাটাই সরানোর পর দেখা গেল একখানা বিশাল পাথর। সুলতানের নির্দেশে তাও সরানো হল। এবার পাওয়া গেল এমন একটি সুরঙ্গপথ যা বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে। এমনকি তা পৌছে গেছে, রওজা শরীফের অতি সন্নিকটে। এ দৃশ্য অবলোকন করা মাত্র নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) বিজলী আহতের ন্যায় চমকে উঠলেন। অস্থিরতার কালো মেঘ ছেয়ে যায় তার সমস্ত হৃদয় আকাশে। ক্রোধে লাল হয়ে যায় গোটা মুখমন্ডল। অবশেষে লোক দুটোকে লক্ষ্য করে ক্ষিপ্ত-ক্রদ্ধ সিংহের ন্যায় গর্জন করে ঝাঁঝাঁলো কন্ঠে বললেন-

“তোমরা পরিস্কার ভাষায় সত্যি কথাটা খুলে বল, নইলে এক্ষুনি তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সম্মুক্ষিন হতে হবে। বল, তোমরা কে? তোমাদরে আসল পরিচয় কী? কারা, কী উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে এখানে পাঠিয়েছে?”

সুলতানের কথায় তারা ঘাবড়ে গেল। কঠিন বিপদ সামনে দেখে আসল পরিচয় প্রকাশ করে বলল,-

“আমরা ইহুদী। দীর্ঘদিন যাবত আমাদেরকে মুসল শহরের ইহুদীরা সুদক্ষ কর্মী দ্বারা প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রচুর অর্থ সহকারে এখানে পাঠিয়েছে। আমাদেরকে এজন্য পাঠানো হয়েছে যে, আমরা যেন কোন উপায়ে মুহাম্মদ (স)-এর শবদেহ বের করে ইউরোপীয় ইহুদীদের হাতে হস্তান্তর করি। এই দুরূহ কাজে সফল হলে তারা আমাদেরকে আরও ধনসম্পদ দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সুলতান বললেন, “তোমরা তোমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলে? কিভাবে তোমরা কাজ করতে?”

তারা বলল, “আমাদের নিয়মিত কাজ ছিল, রাত গভীর হলে অল্প পরিমাণ সুড়ঙ্গ খনন করা এবং সাথে ঐ মাটিগুলো চামড়ার মজকে ভর্তি করে অতি সন্তর্পণে মদীনার বাইরে নিয়ে ফেলে আসা। আজ দীর্ঘ তিন বৎসর যাবত এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে আমরা অনবরত ব্যস্ত আছি। যে সময় আমরা রওজা মোবারকের নিকট পৌছে গেলাম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম যে, এক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বনবীর লাশ বের করে নিয়ে যাব, ঠিক সে সময় ধরে আমাদের মনে হল, আকাশ যেন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। জমীন যেন প্রচন্ড ভূমিকম্পে থরথর করে কাঁপছে। যেন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে মহাপ্রলয় সংঘটিত হচ্ছে। অবস্থা এতটাই শোচনীয় রূপ ধারণ করল, মনে হল সুড়ঙ্গের ভিতরেই যেন আমরা সমাধিস্থ হয়ে পড়ব। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে আমরা কাজ বন্ধ করে রেখেছি।”

তাদের বক্তব্যে সুলতানের নিকট সব কিছুই পরিস্কার হয়ে গেল। তাই তিনি লোক দুটোকে নযীর বিহীন শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন । যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এমন দু:সাহস দেখাতে না পারে। তিনি মসজিদ হতে অর্ধ মাইল দূরে একটি বিশাল ময়দানে বিশ তাহ উঁচু একটি কাঠের মঞ্চ তৈরী করলেন। সাথে সাথে সংবাদ পাঠিয়ে মদীনা ও মদীনার আশেপাশের লোকদেরকে উক্ত ময়দানে হাজির হওয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন।

নির্ধারিত সময়ে লক্ষ লক্ষ লোক উক্ত মাঠে সমবেত হল। সুলতান নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) অপরাধী লোক দুটোকে লৌহ শিকলে আবদ্ধ করে মঞ্চের উপর বসালেন । তারপর বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে তাদের হীন চক্রান্ত ও ঘৃণ্য তৎপরতার কথা উল্লেখ করলেন।

সুলতান নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) -এর বক্তব্য শ্রবণ করে লোকজন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তারা এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করল। সুলতান বললেন- হ্যাঁ, এদের শাস্তি দৃষ্টান্তমূলকই হবে।

তিনি লোকদেরকে বিপুল পরিমাণ লাকড়ী সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন। তারপর লক্ষ জনতার সামনে সেই ইহুদী দুটোকে মঞ্চের নিম্নভাগে আগুন লাগিয়ে পুড়ে ভস্ম করে ফেলেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে, সেই আগুন নাকি দীর্ঘ এগার দিন পর্যন্ত জ্বলছিল।

অত:পর তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে এক হাজার মন সিসা গলিয়ে রওজা শরীফের চতুষ্পার্শে মজবুত প্রাচীর নির্মাণ করে দেন। যেন ভবিষ্যতে আর কেউ প্রিয় নবীজির কবর পর্যন্ত পৌছাতে সক্ষম না হয়। তারপর তিনি কায়মনোবাক্যে আল্লাহ্‌পাকের শুকরিয়া আদায় করলেন এবং তাকে যে এত বড় খেদমতের জন্য কবুল করা হল সেজন্য সপ্তাহকাল ব্যাপী আনন্দাশ্রু বিসর্জন দিলেন। ইতিহাসের পাতা থেকে অবগত হওয়া যায় যে, নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) ইন্তিকাল করলে অসীয়ত মোতাবেক তার লাশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারকের অতি নিকটে দাফন করা হয়।

মহানবী (সা.) এর সাথে জিবরাঈল আ. এর সাক্ষাৎ

ইসলাম ডেস্ক : নবী যুগের গল্প। মদিনার মসজিদে এক পথিক। গায়ে ধবধবে সাদা পোশাক। গভীর কালো চুল। মহানবীর সাক্ষাতে এসেছেন। সঙ্গে একগুচ্ছ প্রশ্ন। হজরত ওমর রা. বলেন, আমরাও নবীজিকে ঘিরে বসে আছি। অপরিচিত পথিক এসে নবীজির সামনে বসলেন। চোখে মুখে খুশির আমেজ। চেনা মুখ তবুও অচেনা। গায়ে মরুভূমির ধূলাবালির ছিটেফোটাও নেই। হাটুঘেরে নবীজির সামনে বসলেন। ঠিক যেন নামাজের বসা।

পথিক বললেন, হে মুহাম্মদ! ইসলাম কী? আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন! মুখ খুললেন নবীজি! বললেন, ইসলাম হচ্ছে তুমি সাক্ষ্য দিবে আল্লাহ ছাড়া কোন প্রভু নেই এবং মুহাম্মদ সা.আল্লাহর রাসুল, নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দিবে, রমজানের রোজা পালন করবে এবং হজের যাওয়ার সামর্থ্য থাকলে হজ করবে! পথিক বললেন, প্রশ্নের জবাবে চমৎকার বলেছেন আপনি! হজরত ওমরসহ সাহাবারা ঘটনা দেখছে বিস্মিত হচ্ছে। মহানবীকে প্রশ্ন, আবার সেই জবাবের শৈল্পিক সত্যায়ন! অবাক হচ্ছেন সাহাবারা। আবারও পথিকের প্রশ্ন! ঈমান কাকে বলে! আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন?

নবীজি বললেন, ঈমান হল আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। সকল ফেরেশতা, সব আসমানি গ্রন্থ, সকল নবী-রাসুল, পরকালের এবং তাকদিরের ভালমন্দের প্রতি তোমার পূর্ণ আস্থা-বিশ্বাস লালন করা। অবাক সাহাবারা! পথিক আবারও বললেন, প্রশ্নের জবাবে চমৎকার বলেছেন আপনি!

পথিকের নতুন প্রশ্ন! ইহসান বা ইবাদতেরপূর্ণতা লাভ হবে কিভাবে? আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন! নবীজি বললেন, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো, যেন তুমি আল্লাহ তায়ালাকে দেখছো। যদি তুমি আল্লাহকে নাও দেখো, মনের কোণে বদ্ধমূল রাখো নিশ্চিয় আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দেখছেন। চমৎকার উত্তর, বললেন পথিক!

পথিকের শেষ প্রশ্ন! কেয়ামত কবে হবে? আমাকে কেয়ামত সম্পর্কে অবহিত করুন! নবীজি থেমে গেলেন। বললেন, এ বিষয়ে আপনিই আমার চেয়ে বেশি অবগত! বেচারা পথিক বললেন, ঠিক আছে,কেয়ামত বাদ রাখুন, তাহলে কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে বলুন? নবীজি বললেন, বাদির সন্তানেরা ক্ষমতাধর হবে, অসহায়-গরীবেরা সুউচ্চ প্রাসাধ নিমার্ণে প্রতিযোগিতা করবে! বাহ! আপনি খুবই অসাধারণ বলেছেন-বললেন পথিক। সাক্ষাৎকার পর্ব এখানেই শেষ!

হজরত ওমর মন্ত্রমুগ্ধের মতো সব শোনলেন। নবীজি বললেন, হে ওমর! জানো এই পথিক কে? ওমর বললেন, আল্লাহ তায়ালা এবং তার রাসুলই সা. ভালো জানেন! নবীজি মৃদু হেসে বললেন, সে অচেনা পথিক নয়। তিনি ওহির বাহক হজরত জিবরাঈল আ.! এসেছিলেন তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য! [সূত্র : বুখারি শরিফ]

জেনে নিন, জান্নাতে সর্ব প্রথম গান শোনাবেন হুরেরা: কেমন হবে সেই গান

জান্নাতে সর্ব প্রথম গান শোনাবেন হুরেরা। তাতে কেটে যাবে ৭০ বছর। জান্নাতি বাতাসে গাছের পাতার সাথে মিলিয়ে অপূর্ব এক বাজনা সৃষ্টি করবে। আর জান্নাতের হুরদের সাথে সুর মিলাবে! সুরের মুর্ছনায় গোটা জান্নাত মুখরিত হয়ে যাবে!!

আল্লাহ্ তখন জান্নাত বাসীদের কাছে জানতে চাইবেন, “কেমন লাগলো”? সকলেই জবাব দিবে, “খুব ভাল”, আল্লাহ্ বলবেন, “এর চেয়েও ভাল শোন”? জান্নাত বাসী বলবে “হে আল্লাহ্ এর চেয়ে ভাল কি”? তখন আল্লাহ্ হযরত দাউদ (আঃ)কে ডাক দিয়ে বলবেন, “হে দাউদ এবার তুমি শুনাও”!!

দাউদ (আঃ) বলবেন, “হে আল্লাহ্ আমার কন্ঠ তো দুনিয়াতে ছিল যবুর শরীফে”। আল্লাহ্ বলবেন, “তোমার কন্ঠ ফিরিয়ে দিলাম, কোরআন শরীফ শোনাও”! হযরত দাউদ(আঃ) কোরআনের সুরা আর রহমান শোনাবেন! জান্নাত বাসী মুগ্ধ হয়ে যাবে!!
আল্লাহ্ আবার বলবেন, “কেমন লাগলো”? জান্নাতিরা বলবে, “মারহাবা, খুব ভাল লাগলো”! আল্লাহ্ বলবেন, “এর চেয়ে ভাল শোন জান্নাত বাসীরা”। বলবে “হে আল্লাহ্ এর চেয়ে ভাল কি হতে পারে”?? আল্লাহ্ পাক রসুলুল্লাহ্ (সাঃ) কে বলবেন, “হে আমার প্রিয় হাবিব এবার আপনি ওদের শোনান”! রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) কোরআনের হৃদয় সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করবেন! পুরা জান্নাত আনন্দে মুখরিত হয়ে যাবে আর ধ্বনি তুলবে,”আল্লাহু আকবার”!!
আল্লাহ্ আবারও জানতে চাইবেন, “কেমন লাগলো”? জান্নাত বাসীরা বলবেন, “আল্লাহ্ সবকিছু থেকে এটাই বেশি ভাল লাগলো”! আল্লাহ্ বলবেন, “এর চেয়েও ভাল আছে”। জান্নাতবাসী অবাক হয়ে বলবে, “আল্লাহ্ এর চেয়ে ভাল কিছু আছে”? আল্লাহ্ জবাব দিবেন, “এর চেয়ে ভাল যা তা হলো তোমাদের রব”! আল্লাহ্ বলবেন, “রিজওয়ান (একজন ফেরেস্তা)পর্দা সরিয়ে দাও, আজ আমার বান্দা আমার দীদার করবে, আমাকে দেখবে”! “আল্লাহু আকবার”! পর্দা সরে যাবে ও সবাই আল্লাহর দীদার লাভ করবে!!

আল্লাহুকে দেখার পরে বান্দা অস্থীর হয়ে যাবে! তখন জান্নাতের হুর কি? শরাব কি? নহর কি? ফল কি? সব কিছুকে মূল্যহীন মনে হবে! বান্দা বলবে,”আল্লাহ্ কিছুই চাইনা, শুধু তোমার দীদার চাই!তোমাকে দেখতে চাই”!
আল্লাহ্ আমাদের কে জান্নাতে কবুল করুন! আমিন! তাই আসুন সকলেই যে যেই অবস্থায় আছি নামাজ কায়েম করি! হে আল্লাহ্ তুমি সবাইকে তোমার ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার মত তৌফিক দান করুন!
সংগৃহীত ।

জেনে নিন, একদিন রাতে ইহুদি মেহমানের সঙ্গে মহানবী (সা.) যা করেছিলেন

একদিন মদিনায় সন্ধ্যা নেমে এলো। মদিনা আলো-বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো বেলালি সুর। মিনারের আল্লাহু ধ্বনি খেজুরের পাতা ছিড়ে পৌঁছে গেল ওলিতে গলিতে। সাহাবিরা মসজিদে। সেজদা-তাসবিহ-তেলাওয়াতে মগ্ন, নবীজী (সা.) তখন মসজিদে। এসময় দয়াল নবীর দরবারে এসে পৌঁছল একদল মুসাফির। সন্ধ্যার এর অবেলায় নবীজি মুসাফিরদের মেহমানদারির আয়োজন করলেন। সাহাবিদের বললেন, যাও মেহমানদের যথাসাধ্য আপ্যায়ন করো, ওরা আমাদের অতিথি। রাসুল নিজেও একজন অতিথি ঘরে নিয়ে গেলেন। আরবের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাপের গন্ধ। পথিক মানেই ভয়-আতঙ্ক। লোটেরা-ডাকাত। সব ডর-ভয় উপেক্ষা করে দয়াল নবী অচেনা অজানা মেহমানদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। রাসুল সা. এর ঘরে সেই অতিথি ছিলো ইহুদি। জেনে শোনেও নবীজি তাকে নিজ হাতে খাওয়ালেন।

ইহুদি বলে কথা। মুহাম্মদকে বিপদে ফেলাতে না পারলে আবার কেমন ইহুদি। সে মনে মনে ইচ্ছা করলো, ‘আজ আমি ঘরের সব খাবার একাই খাব’। ভাবনা ও কাজের মিল পাওয়া গেল। একেবারে পেট পুরে খেলো। নবীজি নিজেই তার বিছানা করলেন। ইহুদি মেহমান গা এলিয়ে দিল ঘুমাবের বিছানায়। গভীর রাত। নীরব নিস্তদ্ধ। ঘুম ভেঙে গেল অতিথির। একেতো মরু পথের দীর্ঘ ক্লান্তি, আবার খেয়েছেও গলা ভরে। এবার বাতরুমের প্রচন্ড চাপ। কিন্তু এতো রাতে, অজানা অচেনা জায়গায় কোথায় যাবে সে? এমন সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বিছানা নষ্ট করে ফেলেছে আগন্তুক। এবার ভয় পেয়ে গেল ইহুদি, মুহাম্মদ সা. মদিনার স¤্রাট। তার ঘরে এমন অপকর্ম? লোকটি ভয়ে পালিয়ে গেলো। ছুটে পালাচ্ছে সে যেদিকে দুচোখ যায়। যদি মুহাম্মদের লোকেরা তাকে ধরে ফেলে – এমন ভয়ে ছুটছে প্রাণপণে।

এমনি সময় তার মনে হলো সে তলোয়ার ফেলে এসেছে মুহাম্মদরে ঘরে। সে সময় তলোয়ার ছাড়া ভ্রমণ কল্পনাই করা যায় না। কি করবে আগন্তুক? সিদ্ধান্ত নিল আবার মদিনায় যাবে, তলোয়ার ছাড়া একমুহুর্তও অসম্ভব। চুপিচুপি মুহাম্মদ সা.-এর ঘরে এসে ঢুকেছে ইহুদি। মনে বড় ভয়! কি জানি কি হয়! আরে! একি কি দেখছে সে? ইহুদি মেহমান নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। রাসুল সা. নিজের হাতের লোকটির নষ্ট করে যাওয়া বিছানা ধুয়ে দিচ্ছেন। চেহারায় রাগের চিহ্ন নেই। রাসুল সা. তাকে দেখে ছুটে এসেছেন তার কাছে। তাকে বলতে লাগলেন, ও ভাই! আমার ভুল হয়ে গেছে, রাতে তোমার খোঁজ নিতে পারিনি, আমার জন্য তুমি অনেক কষ্ট করেছো। আমাকে মাফ করে দাও! ইহুদি ভাবতেও পারছে না এমনটা। মানুষ বুঝি এমন হয়। তাও রক্ত মাংসে গড়া মানুষ! মানবিক মানুষের উপমা। ইহুদি মেহমান এবার মাথা নুইয়ে দিলেন নবীজির কাছে। সমকণ্ঠে উচ্চারন করলেন, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইলাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ। ওগো আল্লাহর নবী-আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি; আল্লাহ এক-আপনি আল্লাহর রাসুল। সূত্র : বায়হাকি

কিয়ামতের দিন যে তিনটি স্থানে রাসুল (স: ) কে পাওয়া যাবে

কিয়ামতের দিন-হযরত আনাস রা: বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে, কিয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশের আবেদন জানালাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (হ্যাঁ) Continue reading “কিয়ামতের দিন যে তিনটি স্থানে রাসুল (স: ) কে পাওয়া যাবে”

রাসুল(সা.) খেজুর ও দুধ দিয়ে সকালের নাস্তা করতেন কেন?

খেজুর ও দুধ দিয়ে-আমাদের নবী (সা.) -এর সকল কাজই আমাদের জন্য আদর্শ। নবী (সা.) -এর ঘুম, খাওয়া, হাটা, চলা এই সকল বিষয়ের মাঝেই আমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু Continue reading “রাসুল(সা.) খেজুর ও দুধ দিয়ে সকালের নাস্তা করতেন কেন?”

সহবাসে যে ভুলের কারণে সন্তান প্রতিবন্ধী হতে পারে

ইসলামে নিষিদ্ধ- মহান আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক পুরুষের জন্য স্ত্রী হিসেবে একজন নারীকে মনোনিত করে রেখেছেন। এই স্ত্রীর সাথে আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযাই সহবাস করলে আমরা সহজেই তৃপ্তি লাভ করতে পারি। Continue reading “সহবাসে যে ভুলের কারণে সন্তান প্রতিবন্ধী হতে পারে”

বৃহস্পতিবার রাতে মৃত্যু হলে কি জান্নাত পাওয়া যায়?

নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পরিবার, সমাজসহ জীবনঘনিষ্ঠ ইসলামবিষয়ক প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠান ‘আপনার জিজ্ঞাসা’। জয়নুল আবেদীন Continue reading “বৃহস্পতিবার রাতে মৃত্যু হলে কি জান্নাত পাওয়া যায়?”

জাবের (রা.)-এর মেহমানদারী ও রাসূল (ছা.)-এর মু‘জিযা!!!

জাবের (রা.) বলেন, খন্দকের যুদ্ধের প্রাক্কালে আমরা পরিখা খনন করছিলাম। এমন সময় একটা শক্ত পাথর দেখা দিল। তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর নিকট এসে বলল, পরিখা খননকালে একটি শক্ত পাথর পাওয়া গেছে। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা আমি নিজেই খন্দকের মধ্যে নামব’। অতঃপর তিনি দাঁড়ালেন, সে সময় তাঁর পেটে পাথর বাঁধা ছিল। আর আমরাও তখন তিনদিন পর্যন্ত কিছু খেতে পায়নি। রাসূলুল্লাহ (ছা.) কোদাল হাতে নিয়ে পাথরটির উপর আঘাত করলে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকণায় পরিণত হয়।

জাবের (রা.) বলেন, আমি আমার স্ত্রীর নিকটে এসে বললাম, ‘তোমার কাছে খাওয়ার কিছু আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ (ছা.)-কে ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখলাম’। তখন সে একটি চামড়ার পাত্র হ’তে এক ছা‘ পরিমাণ যব বের করল। আমাদের একটি মোটাতাজা বকরীর বাচ্চা ছিল।তা আমি যবেহ করলাম আর আমার স্ত্রী যব পিষল। অবশেষে আমরা হাঁড়িতে গোস্ত চড়ালাম। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর নিকট এসে চুপে চুপে বললাম, ‘আল্লাহ্‌র রাসূল (ছা.)! আমরা একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করেছি। আর এক ছা‘ যব ছিল, আমার স্ত্রী তা পিষেছে। সুতরাং আপনি আরো কয়েকজন সঙ্গে নিয়ে চলুন’।

রাসূলুল্লাহ (ছা.) উচ্চৈঃস্বরে সবাইকে বললেন, ‘হে পরিখা খননকারীগণ! এস তোমরা তাড়াতাড়ি চল, জাবের তোমাদের জন্য খাবার তৈরী করেছে’। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছা.) আমাকে বললেন, ‘তুমি বাড়ী ফিরে যাও। আমি না আসা পর্যন্ত গোস্তের ডেকচি নামাবে না এবং খামির থেকে রুটিও বানাবে না’। এরপর তিনি লোকজনসহ উপস্থিত হ’লেন। তখন আমার স্ত্রী খামিরগুলি রাসূলের সম্মুখে দিলে তিনি তাতে লালা মিশিয়ে দিয়ে বরকতের জন্য দো‘আ করলেন। অতঃপর ডেকচির নিকট অগ্রসর হয়ে তাতেওলালা মিশিয়ে বরকতের জন্য দো‘আ করলেন। এরপর বললেন, ‘তুমি আরো রুটি প্রস্তুতকারিণীদের ডাক, যারা তোমার সাথে রুটি বানাবে। আর চুলার উপর থেকে ডেকচি না নামিয়ে তুমি তা থেকে তরকারী নিয়ে পরিবেশন কর’।

জাবের (রা.) বলেন, ‘ছাহাবীদের সংখ্যা ছিল এক হাযার। আমি আল্লাহ্‌র কসম করে বলছি, সকলে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে চলে যাওয়ার পরও ডেকচি ভর্তি তরকারী ফুটতেছিল এবং প্রথম অবস্থার ন্যায় আটার খামিরহ’তে রুটি প্রস্তুত হচ্ছিল’

{মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৮৭৭ ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’ অধ্যায়, ‘মু‘জিযা’ অনুচ্ছেদ}।

শিক্ষা :
১. কর্মীদের উৎসাহ ও প্রেরণা দানের জন্য নেতাকে তাদের সাথে যে কোন কাজে নিজ হাতে সহযোগিতা করা।
২. কর্মীদের অন্যতম কর্তব্য হ’ল নেতার সার্বিক বিষয়ের প্রতি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখা।
৩. রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর পক্ষ হ’তে প্রকাশিত প্রত্যেক মু‘জিযার প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস রাখা।
৪. দ্বীনের পথে যত কষ্টই আসুক না কেন হাসিমুখে তা বরণ করে নেওয়া।

মহানবী (সাঃ) বলেন- ‘যে ব্যক্তি এই সূরা প্রতি রাতে পাঠ করবেন তাঁকে কখনই দরিদ্রতা স্পর্শ করবে না’

অন্তিম রোগশয্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)— এর শিক্ষাপ্রদ কথোপকথনঃ ইবনে—কাসীর ইবনে আসাকীরের বরাত দিয়ে এই ঘটনা বর্ণনা করেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) যখন অন্তিম রোগশয্যায় শায়িত ছিলেন, তখন আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওসমান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান৷ তখন তাঁদের মধ্যে শিক্ষাপ্রদ যে কথোপকথন হয় তা নিম্নরুপঃ-

→হযরত ওসমানঃ ما تشتكي আপনার অসুখটা কি?

→হযরত ইবনে মাসউদঃ ذنوبي আমার পাপসমূহই আমার অসুখ৷

→ওসমান গণীঃ ما تشتهي আপনার বাসনা কি?

→ইবনে মাসউদঃ رحمة ربي আমার পালনকর্তার রহমত কামনা করি৷

→ওসমান গণীঃ আমি আপনার জন্যে কোন চিকিৎসক ডাকব কি?

→ইবনে মাসউদঃ الطبيب امرضني চিকিৎসকই আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন৷

→ওসমান গনীঃ আমি আপনার জন্যে সরকারী বায়তুল মাল থেকে কোন উপটৌকন পাঠিয়ে দেব কি?

→ইবনে মাসউদঃ لاحاجة لي فيها এর কোন প্রয়োজন নেই৷

→ওসমান গণীঃ উপটৌকন গ্রহণ করুন৷ তা আপনার পর আপনার কন্যাদের উপকারে আসবে৷

→ইবনে মাসউদঃ আপনি চিন্তা করছেন যে, আমার কন্যারা দারিদ্র ও উপবাসে পতিত হবে৷ কিন্তু আমি এরুপ চিন্তা করি না৷ কারণ, আমি কন্যাদেরকে জোর নির্দেশ দিয়ে রেখেছি যে, তারা যেন প্রতিরাত্রে সূরা ওয়াক্কিয়া পাঠ করে৷

আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)— কে বলতে শুনেছি,
من قرأ سورةالواقعة كل ليلة لم تصبه فاقة ابدا”
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াক্কিয়া পাঠ করবে, সে কখনও উপবাস করবে না৷

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ [রা.] বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিদিন রাতে সুরা ওয়াক্বিয়াহ তেলাওয়াত করবে তাকে কখনো দরিদ্রতা স্পর্শ করবে না। হজরত ইবনে মাসউদ [রা.] তাঁর মেয়েদেরকে প্রত্যেক রাতে এ সুরা তেলাওয়াত করার আদেশ করতেন। [বাইহাকি:শুআবুল ঈমান-২৪৯৮]

সুরা আর রাহমান, সুরা হাদিদ ও সুরা ওয়াকিয়া’র তেলাওয়াতকারীকে কেয়ামতের দিন জান্নাতুল ফিরদাউসের অধিবাসী হিসেবে ডাকা হবে। অন্য এক হাদিসে আছে, সুরা ওয়াকিয়াহ হলো ধনাঢ্যতার সুরা, সুতরাং তোমরা নিজেরা তা পড় এবং তোমাদের সন্তানদেরকেও এ সুরার শিক্ষা দাও। অন্য এক বর্ণনায় আছে: তোমাদের নারীদেরকে এ সুরার শিক্ষা দাও। আম্মাজান হজরত আয়েশা [রা.] কে এ সুরা তেলাওয়াত করার জন্য আদেশ করা হয়েছিল।

তাছাড়া অভাবের সময় এ সুরার আমলের কথাটা তো হাদিস দ্বারাই প্রমানিত। এমনকি বর্ণিত আছে যে হজরত ইবনে মাসউদ [রা.] কে যখন তার সন্তানদের জন্য একটি দিনারও রেখে না যাওয়ার কারণে তিরস্কার করা হলো তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, তাদের জন্য আমি সুরা ওয়াকিয়াহ রেখে গেলাম। [ফয়জুল কাদির-৪/৪১]

সুবহানাল্লাহ! মহান রাব্বুল ইজ্জতের পবিত্র কালামের বরকত কত পাওয়ারফুল আপনি-আমি তা অনুধাবন করতে পারি কি?
তাই আসুন সকলে সূরা ওয়াক্কিয়া পাঠের এই অতি মূল্যবান আমলটি প্রতিদিন আদায় করার চেষ্টা করি৷ আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে আমল করার তাওফিক দিন৷ আমীন