অত্যাচারী বাদশাহর তৈরি করা দুনিয়ার বেহেশতের কাহিনি !

শাদ্দাদ বলক্ষমতাবান বাদশাহ শাদ্দাদ, হযরত হুদ (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উনার দাওয়াতে ইসলাম ধর্ম গ্রহন না করে, বরং হযরত হুদ (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মুখে পরকালের বেহেশতের বর্ননা শুনে,ল, তোমার আল্লাহর বেহেশত আমার প্রয়োজন নেই। বেহেশতের যে নিয়ামত ও সুখ-শান্তির বিবরণ তুমি দিলে, অমন বেহেশত আমি নিজে এই পৃথিবীতেই বানিয়ে নিব। তুমি দেখে নিও। তারপর সাদ্দাদ দুনিয়াতে বেহেশত নির্মান করার জন্য প্রস্তুতি নিল ।

অবশেষে ইয়ামানের একটি শস্য শ্যামল অঞ্চলে প্রায় একশ চল্লিশ বর্গ মাইল এলাকার একটি জায়গা নির্বাচন করা হল। বেহেশত নির্মাণের জন্য প্রায় তিন হাজার সুদক্ষ কারিগর কে নিয়োগ করা হল। নির্মান কাজ শুরু হয়ে গেলে শাদ্দাদ তার অধীনস্থ প্রজাদের জানিয়ে দিল যে, কারো নিকট কোন সোনা রূপা থাকলে সে যেন তা গোপন না করে এবং অবিলম্বে তা রাজ দরবারে পাঠিয়ে দেয়।

এ ব্যাপারে তল্লাশী চালানো হয় সারাটি রাজ্যে। কারো কাছে এক কণা পরিমাণ সোনা-রূপা পেলেও তা কেড়ে নিতে লাগল। এক বিধবার শিশু মেয়ের কাছে চার আনা পরিমাণ রূপার গহনা পেয়ে তাও তারা কেড়ে নিল। মেয়েটি কেঁদে গড়াগড়ি দিতে লাগল। তা দেখে বিধবা আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ জানাল যে, হে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, এই অত্যাচারী বাদশাহ কে তুমি তার বেহেশত উপভোগ করার সুযোগ দিও না। দুঃখিনী মজলুম বৃদ্ধ মায়ের এই দোয়া কবুল হয়ে গিয়েছিল।

ওদিকে শাদ্দাদের বেহেশত নির্মানের কাজ ধুমধামের সাথে চলতে লাগল। বিশাল ভূখন্ডের চারদিকে চল্লিশ গজ জমি খনন করে মাটি ফেলে মর্মর পাথর দিয়ে বেহেশতের ভিত্তি নির্মান করা হল। তার উপর সোনা ও রূপার ইট দিয়ে নির্মিত হল প্রাচীর। প্রাচীরের উপর জমরূদ পাথরের ভীম ও বর্গার উপর লাল বর্ণের মূল্যবান আলমাছ পাথর ঢালাই করে প্রাসাদের ছাদ তৈরী হল। মূল প্রাসাদের ভিতরে সোনা ও রূপার কারূকার্য খচিত ইট দিয়ে বহু সংখ্যক ছোট ছোট দালান তৈরী করা হল।

সেই বেহেশতের মাঝে মাঝে তৈরী করা হয়েছিল সোনা ও রূপার গাছ-গাছালি এবং সোনার ঘাট ও তীর বাধানো পুকুর ও নহর সমূহ। আর তার কোনটি দুধ, কোনটি মধু ও কোনটি শরাব দ্বারা ভর্তি করা হয়েছিল। বেহেশতের ভিতরে দুনিয়াবি মাটির পরিবর্তে শোভা পেয়েছিল সুবাসিত মেশক ও আম্বর এবং মূল্যবান পাথর দ্বারা তার মেঝে নির্মিত হয়েছিল। বেহেশতের প্রাঙ্গন মণিমুক্তা দ্বারা ঢালাই করা হয়েছিল। বর্ণিত আছে যে, এই বেহেশত নির্মাণ করতে প্রতিদিন অন্ততঃ চল্লিশ হাজার গাধার বোঝা পরিমাণ সোনা-রূপা নিঃশেষ হয়ে যেত। এইভাবে একাধারে তিনশ’ বছর ধরে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

এরপর কারিগরগণ শাদ্দাদ কে জানাল যে, বেহেশত নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। শাদ্দাদ খুশী হয়ে আদেশ দিল যে, এবার রাজ্যের সকল সুন্দর যুবক-যুবতী ও বালক-বালিকাকে বেহেশতে এনে জড়ো করা হোক। নির্দেশ যথাযথভাবে পালিত হলো। অবশেষে একদিন শাদ্দাদ সপরিবারে বেহেশত অভিমুখে রওনা হল। তার অসংখ্য লোক-লস্কর বেহেশতের সামনের প্রান্তরে তাকে অভিবাদন জানাল। শাদ্দাদ অভিবাদন গ্রহণ করে বেহেশতের প্রধান দরজার কাছে গিয়ে উপনীত হল। দেখল, একজন অপরিচিত লোক বেহেশতের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। শাদ্দাদ তাকে জিজ্ঞেস করল,তুমি কে?
লোকটি বললেনঃ আমি মৃত্যুর ফেরেশতা আজরাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

শাদ্দাদ বললঃ তুমি এখন এখানে কি উদ্দেশ্য এসেছ?আজরাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমার প্রতি নির্দেশ এসেছে তোমার জান কবজ করার।শাদ্দাদ বললঃ আমাকে একটু সময় দাও। আমি আমার তৈরী পরম সাধের বেহেশতে একটু প্রবেশ করি এবং এক নজর ঘুরে দেখি।
আজরাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমাকে এক মুহুর্তও সময় দানের অনুমতি নেই।
শাদ্দাদ বললঃ তাহলে অন্ততঃ আমাকে ঘোড়া থেকে নামতে দাও।
আজরাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, তুমি যে অবস্থায় আছ, সে অবস্থায়ই তোমার জান কবজ করা হবে।
শাদ্দাদ ঘোড়া থেকে এক পা নামিয়ে দিল। কিন্তু তা বেহেশতের চৌকাঠ স্পর্শ করতে পারলনা। এই অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটল। তার বেহেশতের আশা চিরতরে নির্মূল হয়ে গেল।

ইতোমধ্যে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার নির্দেশে হযরত জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক প্রচন্ড আওয়াজের মাধ্যমে শাদ্দাদের বেহেশত ও লোক-লস্কর সব ধ্বংস করে দিলেন।এভাবে শাদ্দাদের রাজত্ব চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

বর্ণিত আছে যে, হযরত মুয়াবিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার রাজত্বকালে আব্দুল্লাহ বিন কালব নামক এক ব্যক্তি ইয়েমেনের একটি জায়গায় একটি মূল্যবান পাথর পেয়ে তা হযরত মুয়াবিয়ার (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার নিকট উপস্থাপন করেন। সেখানে তখন কা’ব বিন আহবার (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উপস্থিত ছিলেন। তিনি উক্ত মূল্যবান রত্ন দেখে বললেন, এটি নিশ্চয় শাদ্দাদ নির্মিত বেহেশতের ধ্বংসাবশেষ।

যে কারণে সাহাবাদের একটি খেজুরও দিলেন না নবী সা

গ্রাম থেকে একজন দরিদ্র সাহাবী এসেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দেখা করার জন্য। সাথে এনেছেন একটা থলে ভর্তি খেজুর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের নিয়ে মসজিদে নববীর পাশে সুফফার নির্ধারিত জায়গায় বসে আছেন। সাহাবীগণ একমনে তাঁর কথা শুনছেন। গ্রামীণ সাহাবী দূর থেকে তাঁকে সালাম দিলেন। এরপর একটু সামনে এগিয়ে এসে সাথে করে আনা খেজুরের থলে তাঁর হাতে তুলে দিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওই সাহাবীর সামনেই থলে থেকে খেজুর বের করে খুব তৃপ্তি সহকারে খেতে শুরু করলেন। সাহাবীর দু‘ঠোঁট গলিয়ে আনন্দের ঝিলিক হাসি হয়ে বেরিয়ে এলো। তা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো খেজুর বের করে খেতে লাগলেন।

সুফফার সাহাবাগণ তো অবাক! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো কখনো এমন করেন না। আমরা এতোগুলো মানুষ এখানে বসে আছি, কাউকে একটি খেজুরও তিনি দিচ্ছেন না। একা একাই একের পর এক সবগুলো খেজুর তিনি খেয়ে যাচ্ছেন। আজকে হলোটা কী?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একা একা খেজুর খেয়েই যাচ্ছেন আর ওই সাহাবীর চোখে মুখে আনন্দের দীপ্তি ক্রমেই বেড়ে চলছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবগুলো খেজুর খাওয়া শেষ হলে সাহাবী দোয়া নিয়ে চলে গেলেন।
উপস্থিত সাহাবাগণ এবার মুখ খুললেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজকে এমনটা কেন হলো? আমাদের কাউকে একটি খেজুরও আপনি খাওয়ার জন্য দিলেন না। অথচ আমাদের কাউকে না দিয়ে আপনি কখনো তো কিছুই খাননি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা কি খেয়াল করে দেখেছো, আমি যখন খেজুরগুলো খাচ্ছিলাম তখন তার চোখে মুখে সীমাহীন আনন্দের দীপ্তি কেমন করে ঝলমল করছিলো।
হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তা লক্ষ্য করেছি।
আসলে খেজুরগুলো খুব সুস্বাদু ছিলো না। আমার কাছে ভীষণ কইষ্ট্যা কইষ্ট্যা লাগছিলো। কিন্তু তা আমি মুখে প্রকাশ করিনি। চোখে মুখে হাসি ফুটিয়ে রেখে আমি ওকে বুঝাতে চেয়েছি খেজুরগুলো আমার খুব ভালোই লাগছে। ওগুলো তোমাদেরকে দিলে তোমরা হয়তো এমন কিছু করে বসতে যাতে সে বুঝে ফেলতো খেজুরগুলো সুস্বাদু নয়। তাই ওগুলো তোমাদেরকে দেয়া আমি সমীচীন মনে করিনি। আমি চাইনি ওর এতো সুন্দর একটা আনন্দ এতো সহজেই নষ্ট হয়ে যাক।

সংগৃহিত : আমাদের ইসলাম ডট কম

মৃত্যুর অল্প কিছুক্ষণ আগে মানুষের সাথে যা হয়

মৃত্যু একটি অবধারিত বিষয়। ‘জন্মিলে মরতে হবে’ এটি থেকে কারো বাঁচার উপায় নেই। মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘পৃথিবীর সব প্রাণীকেই মৃত্যুস্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় মৃত্যুকে। এর থেকে বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু মৃত্যু থেকে কারো বেঁচে থাকার উপায় নেই। জলে-স্থলে যেখানেই থাকুন মৃত্যু আসবেই। তবে মৃত্যু কিভাবে সহজ হয় তার বর্ণনা এসেছে হাদিসে পাকে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মৃত্যুকালীন সময়ের এ কষ্টের বিবরণ তাঁর উম্মতকে জানিয়ে দিয়েছেন। আবার মৃত্যুর এ ভয়াবহতা থেকে মুক্তি লাভের সুস্পষ্ট আমলও শিখিয়ে গেছেন। তাম্বীহুল গাফেলিনে মৃত্যুকালীন কষ্টের ওপর একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে, হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার হজরত কাব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন, আমাকে মৃত্যুর অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন। তখন হজরত কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘মৃত্যু হলো কাঁটাদার গাছের মতো। কাঁটাযুক্ত সে গাছটি যখন মানুষের পেটে ঢোকানোর পর তার প্রতিটি কাঁটা শিরায় শিরায় লেগে যায়। তখন একজন শক্তিশালী মানুষ যদি গাছটি ধরে জোরে টেনে বের করার চেষ্টা করে। ওই মুহূর্তে শিরায় শিরায় বিদ্ধ হওয়া কাঁটার আঘাতের কষ্ট মানুষটি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে।
অনুরূপভাবে মানুষের মৃত্যুকালীন সময়ে মৃত্যুপথযাত্রীর কাছেও মনে হয় যেন, তার শরীরের গোশতগুলো যেন একটি কাঁটার সঙ্গে বেরিয়ে আসছে। সে মৃত্যুযন্ত্রণা মানুষ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে থাকে।
এ হলো মৃত্যুকালীন সময়ে মানুষের মৃত্যু যন্ত্রণার নমুনা। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে সেভাবে ভয় কর; যেভাবে ভয় করা উচিত। এবং অবশ্যই (সবধান!) মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ [সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১০২]
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমের মাধ্যমে মানুষকে আগেই সতর্ক করে দিয়েছেন। মৃত্যুর পূর্বে ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করে পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হয়ে যাও। তবেই মৃত্যুকালীন কষ্টসহ পরকালের প্রথম মনজিল কবর, ফুলসিরাত, হাশরের ময়দান এবং আল্লাহর বিচারের দিন নাজাত লাভ করবে।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মৃত্যুকালীন সময়ের কষ্ট থেকে হেফাজত করুন। পরকালের নাজাত দান করুন। আমিন।

আল্লাহর কাছে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধির তিন আমল

তিনপ্রকারের আমলের মাধ্যমে মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে: ১. মেহমান ও দরিদ্রদের খাবার খাওয়ানো। সালামের ব্যাপক প্রসার করা এবং ৩. রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন নামাজে মশগুল হয়ে যাওয়া (আলমু’জামুল আওসাত্ব: ৬/৩৫১)। প্রথম বিষয়, মর্যাদাবৃদ্ধির প্রথম আমল হলো, অসহায়-দরিদ্র এবং মেহমানদের খাবার খাওয়ানো এবং সাথে সাথে এ ধারণাও রাখা যে, আমার কোন অনুগ্রহ তাদের ওপর নেই, যাদেরকে আমি খাবার খাওয়াচ্ছি। বরং আল্লাহর অশেষ কৃপা ও আমার মেহমানদারী গ্রহণকারিদের অনেক বড় অনুগ্রহ হয়েছে আমার উপর। এজন্যই আমি তাদের মেহমানদারি করাতে পারছি। কেননা, তাদের আহার্য তো আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির পূর্বক্ষণ হতেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। এসকল বিষয়কে স্বরণ রেখে যারা অন্যকে খাবার খাওয়াবে, আল্লাহ তায়ালা তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিবেন।

রাসুল (সা.) বলেছেন, তিনপ্রকারের লোক বড় সৌভাগ্যবান হয়ে থাকে এবং আল্লাহর দরবারে তাদেরকে সীমাহীন প্রতিদানে ধন্য করা হবে: ১. কোন মুমিন বান্দা অপর মুমিনকে পিপাসাকাতর অবস্থায় পানীয় পান করাবে, কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তায়ালা তাকে এমন বিশেষ প্রজাতীয়- উত্তম পানীয় পান করাবেন, যার প্রতিটা পানপাত্র সিলমোহরকৃত থাকবে। কোন মুমিন অপর মুমিনকে ক্ষুধাকাতর অবস্থায় খাবার খাওয়ালে কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের বিভিন্নপ্রকারের তুলনাহীন ফলমূল খাওয়াবেন। কোন মুমিন অপর অভাবী- বস্ত্রহীন মুমিনের বস্ত্র- আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করলে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের দামী আচ্ছাদনে ধন্য করবেন। তা থেকে প্রতিয়মান হয়, অন্যের আহার্যের ব্যবস্থা করার অনেক ফযিলত রয়েছে এবং এমন ব্যক্তির জন্য সুখসংবাদের ঘোষনাও রয়েছে।
দ্বিতীয় বিষয়, সালামের ব্যাপক প্রসার ঘটানো। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সালামের ব্যাপক প্রসার করতে থাকো। এতে তোমাদের পারস্পরিক মেলবন্ধন তৈরি হবে।’ রাসুল (সা.) পারস্পরিক ঐক্য-স¤প্রীতি, ভালোবাসাকে ইমানের শর্তরুপে নির্ধারণ করেছেন। এছাড়াও সালামের মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধিই পেয়ে থাকে। সুতরাং সালামের ব্যাপক প্রসার ঘটানো উচিৎ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘জান্নাতে প্রবেশের জন্য ইমান থাকা শর্ত। আর পূর্ণাঙ্গ মুমিন হওয়ার জন্য পারস্পরিক জোগসাজেশ-ভালোবাসা ও সৌজন্যবোধ থাকা আবশ্যক। যদি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা-সৌজন্যতা না থাকে, তাহলে তোমরা কখনোই পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না। ’ অতপর তিনি বলেন, পারস্পরিক শত্রæতা-অহংবোধ ও বিদ্বেষ দূর করার সবচে কার্যকরী মাধ্যম হলো, ‘তোমরা সালামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার করো। কেননা, সালাম উল্লেখিত মন্দস্বভাবগুলো দূর করার ক্ষেত্রে সবচে উপকারী মাধ্যম। একই সঙ্গে পারস্পরিক ভালোবাসা-প্রীতির বন্ধন জুড়ে দেওয়ারও পরিক্ষিত আমল।’
তৃতীয় বিষয়, রাতের শেষাংশে তাহাজ্জুদে দাড়িয়ে কোরআন তিলাওয়াত করা, যখন সবাই সুখতন্দ্রায় ডুবে থাকে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা অনেক পছন্দ করে থাকেন:
১.যে ব্যক্তি রাতের শেষাংশে তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজে দাঁড়িয়ে কোরআন হতে তিলাওয়াত করে; যখন সবাই ঘুমে বিভোর থাকে।
২. যে ব্যক্তি কোন লড়াইয়ের ময়দানে জমে লড়াই করতে থাকে; যখন তার অন্যান্য সাথীবৃন্দ পরাজয় বরণ করে রণাঙ্গনে পিঠ দেখিয়ে পালিয়ে যায় এবং
৩.যে ব্যক্তি এমন গোপনে-চুপিসারে দান-সদকা করে, তার বাঁহাতও টের পায়না যে, সে ডানহাতে কী দান করেছে।’ লেখক: শিক্ষার্থী, দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারত।

যুল-কিফলের জীবনে পরীক্ষা:ইবলিশ ঐ দিন তার সাথে যা করেছিল

যুল-কিফল’ উক্ত মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন দেখে ইবলীস হিংসায় জ্বলে উঠল। সে তার বাহিনীকে বলল, যেকোন মূল্যে তার পদস্খলন ঘটাতেই হবে। কিন্তু সাঙ্গ-পাঙ্গরা বলল, আমরা ইতিপূর্বে বহুবার তাকে ধোঁকা দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। অতএব আমাদের পক্ষে একাজ সম্ভব নয়। তখন ইবলীস স্বয়ং এ দায়িত্ব নিল।

যুল-কিফল সারা রাত্রি ছালাতের মধ্যে অতিবাহিত করার কারণে কেবলমাত্র দুপুরে কিছুক্ষণ নিদ্রা যেতেন। ইবলীস তাকে রাগানোর জন্য ঐ সময়টাকেই বেছে নিল। একদিন সে ঠিক দুপুরে তার নিদ্রার সময় এসে দরজার কড়া নাড়লো। কাঁচা ঘুম থেকে উঠে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? উত্তর এল, আমি একজন বৃদ্ধ মযলূম। তিনি দরজা খুলে দিলে সে ভিতরে এসে বসলো এবং তার উপরে যুলুমের দীর্ঘ ফিরিস্তি বর্ণনা শুরু করল। এভাবে দুপুরে নিদ্রার সময়টা পার করে দিল। যুল-কিফল তাকে বললেন, আমি যখন বাইরে যাব, তখন এসো। আমি তোমার উপরে যুলুমের বিচার করে দেব’।

যুল-কিফল বাইরে এলেন এবং আদালত কক্ষে বসে লোকটির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু সে এলো না। পরের দিন সকালেও তিনি তার জন্য অপেক্ষা করলেন, কিন্তু সে এলো না। কিন্তু দুপুরে যখন তিনি কেবল নিদ্রা গেছেন, ঠিক তখনই এসে কড়া নাড়ল। তিনি উঠে দরজা খুলে দিয়ে তাকে বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি যে, আদালত কক্ষে মজলিস বসার পর এসো। কিন্তু তুমি কালও আসনি, আজও সকালে আসলে না। তখন লোকটি ইনিয়ে-বিনিয়ে চোখের পানি ফেলে বিরাট কৈফিয়তের এক দীর্ঘ ফিরিস্তি পেশ করল। সে বলল, হুযুর! আমার বিবাদী খুবই ধূর্ত প্রকৃতির লোক। আপনাকে আদালতে বসতে দেখলেই সে আমার প্রাপ্য পরিশোধ করবে বলে কথা দেয়। কিন্তু আপনি চলে গেলেই সে তা প্রত্যাহার করে নেয়’। এইসব কথাবার্তার মধ্যে ঐদিন দুপুরের ঘুম মাটি হ’ল।

তৃতীয় দিন দুপুরে তিনি ঢুলতে ঢুলতে পরিবারের সবাইকে বললেন, আমি ঘুমিয়ে গেলে কেউ যেন দরজার কড়া না নাড়ে। বৃদ্ধ এদিন এলো এবং কড়া নাড়তে চাইল। কিন্তু বাড়ীর লোকেরা তাকে বাধা দিল। তখন সে সবার অলক্ষ্যে জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল এবং দরজায় ধাক্কা-ধাক্কি শুরু করল। এতে যুল-কিফলের ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখলেন সেই বৃদ্ধ ঘরের মধ্যে অথচ ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। তিনি বুঝে ফেললেন যে, এটা শয়তান ছাড়া কেউ নয়। তখন তিনি বললেন, তুমি তাহ’লে আল্লাহর দুশমন ইবলীস? সে মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। আমি আজ আপনার কাছে ব্যর্থ হ’লাম। আপনাকে রাগানোর জন্যই গত তিনদিন যাবত আপনাকে ঘুমানোর সময় এসে জ্বালাতন করছি। কিন্তু আপনি রাগান্বিত হলেন না। ফলে আপনাকে আমার জালে আটকাতে পারলাম না। ইতিপূর্বে আমার শিষ্যরা বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। আজ আমি ব্যর্থ হ’লাম। আমি চেয়েছিলাম, যাতে আল-ইয়াসা‘ নবীর সাথে আপনার কৃত ওয়াদা ভঙ্গ হয়। আর সে উদ্দেশ্যেই আমি এতসব কান্ড ঘটিয়েছি। কিন্তু অবশেষে আপনিই বিজয়ী হলেন’।

উক্ত ঘটনার কারণেই তাঁকে ‘যুল-কিফল’ (ذو الكفل)। উপাধি দেওয়া হয়। যার অর্থ, দায়িত্ব পূর্ণকারী ব্যক্তি।

মুহাম্মদের (সা.) যে কথায় কাঁপলো আবু জাহেল

ইবনে ইসহাক বলেন, আরাসের এক ব্যক্তি কিছু উঠ নিয়ে মক্কায় এলেন। আবু জাহেল তার উঠগুলো ক্রয় করে। ওই ব্যক্তি পাওনা দাবি করলে আবু জাহেল তালবাহান শুরু করে।

ওই আরাসি হতাশ হয়ে একদিন হারামে কা’বায় কুরাইশদের সরদারের কাছে যেয়ে বিচার দাবি করে। অপরদিকে হারাম শরীফের এক পাশে নবী কারীম সা. বসা ছিলেন। সরদার নবী কারীম সা. কে দেখিয়ে ওই আরাসিকে বললেন, ‘আমি কিছু করতে পারবো না। যাও ওই ব্যক্তির কাছে। তিনি তোমার পাওনা আদায় করে দিবেন।’ সরদারের কথায় আরাসি হুজুর সা. এর কাছে যাচ্ছিলেন আর সরদার নিজে নিজে বলতে থাকেন, ‘আজ অনুগ্রহ নেমে আসবে’।

আরাসি নবী কারীম সা. এর কাছে তার অভিযোগ তুলে ধরলেন। হুজুর সা. তখনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং ওই ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে আবু জাহেলের বাড়ির দিকে রওনা হন। সরদার হুজুর সা. এর পেছনে একজন লোক পাঠিয়ে দিলেন। হুজুর সা. সোজা আবু জাহেলের বাড়িতে গেলেন। দরজায় শব্দ করেন। আবু জাহেল জানতে চাইল, কে? হুজুর সা. বললেন, মুহাম্মদ সা.। সে চিন্তিত হয়ে বাইরে আসে।

হুজুর সা. তাকে বললেন, এই ব্যক্তির হক আদায় করে দাও। সে কোন চুঁ চারা না করেই ঘরে যেয়ে উঠের মূল্য নিয়ে এসে ওই ব্যক্তির হাতে অর্পন করে। কুরাইশের সংবাদদাতা এ ঘটনা দেখে হারামের দিকে দৌঁড়ালেন এবং সরদারকে সব খুলে বললেন। সংবাদদাতা বলছিলেন, আল্লাহর কসম! সে আজ এমন এক আশ্চর্যকর ঘটনা দেখেছে যা কখানো এর আগে দেখেনি। আবু জাহেল ঘর থেকে বেরিয়ে হুজুর সা. কে দেখেই তার মুখবর্ণ ফেকাসে হয়ে যায়। আর মুহাম্মদ সা. যখন বললেন তার হক আদায় করে দাও, তখন এমন মনে হচ্ছিল যে আবু জাহেলের দেহে প্রাণ ছিল না।

সূত্র : ইবনে হিশাম