রোজার আগে যে হাদিস গুলো আপনাকে জানতেই হবে

বছর পরিক্রমায় মহান রববুল ‘আলামীনের মেহেরবাণীস্বরূপ রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের সওগাত নিয়ে রমাদানুল মুবারক একজন মু’মিনের জীবনে হাযির হয়। পবিত্র রমাদানেই পূর্ণ একমাস রোজার মাধ্যমে মু’মিন ব্যক্তি মহান আল্লাহ তা’আলার ‘তাক্ওয়া’ হাসিল করার সুযোগ লাভ করে। ‘রোজা’ এটি ফার্সী শব্দ। আরবিতে বলা হয় ‘সওম’, বহু বচনে ‘সিয়াম’। এ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে : বিরত থাকা, আÍসংযম, কঠোর সাধনা করা, অবিরাম চেষ্টা করা ইত্যাদি। ইসলামী পরিভাষায় ‘সুবহি সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার, যৌনসম্ভোগ ও আল্লাহর নিষিদ্ধ সকল কর্মকান্ড থেকে বিরত থেকে মহান আল্লাহভীতি বা ‘তাক্ওয়া’ অর্জনের চেষ্টা করার নাম ‘রোজা’। মানুষের মধ্যে যে পশুপ্রবৃত্তি বা ‘নাফ্স’ রয়েছে যা মানুষকে সর্বদাই অন্যায়, লোভ ও খারাপ কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করে, ঐ কু-প্রবৃত্তিতে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করে ইসলামের প্রতিটি বিধানকে সঠিকভাবে পালন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাঁর নাফরমানীর আযাবের ভয় অন্তরে সৃষ্টি করাই হলো রোজার উদ্দেশ্য। দীর্ঘ একমাস যাবৎ সংযম সাধনার মাধ্যমে মহান আল্লাহর ‘তাক্ওয়ার’ গুণ অর্জন করার জন্য রোজা পালনের যে নিয়মকানুন বিধি-বিধান রয়েছে এবারে আমরা তাই আলোচনা করবো।

১. রমাদান মাসে রোজা রাখা ফরয : মহান আল্লাহর ঘোষণা হলো : ‘‘রমাদান মাস, এ মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানব জাতির জন্য পুরোপুরি হিদায়াত এবং এমন দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা সংবলিত, যা সত্য-সঠিক পথপ্রদর্শন করে এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়। কাজেই এখন থেকে যে ব্যক্তি এ মাসের সাক্ষাৎ পাবে তার জন্য এই সম্পর্ণ মাসটিতে রোজা রাখা অপরিহার্য।’’ (সূরা, আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৮৫)। অর্থাৎ প্রতি রমাদান মাসে প্রত্যেক সুস্থ, বয়ঃপ্রাপ্ত মুকিম ও সক্ষম মুসলমান নর-নারীর প্রতি সুব্হি সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখা ফরয বা অবশ্য কর্তব্য। ২. রোজার উদ্দেশ্য হলো ‘তাক্ওয়া’ বা আল্লাহভীতি হাসিল করা : মহান আল্লাহর ঘোষণা হলো : ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরয করে দেয়া হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীদের ওপর ফরয করা হয়েছিল। এ থেকে আশা করা যায়, তোমাদের মধ্যে তাক্ওয়ার গুণাবলি সৃষ্টি হয়ে যাবে।’’ (সূরা, আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৮৪) ৩. সত্যবাদী, ন্যায় ও কল্যাণকর চরিত্রবানরূপে গড়ে ওঠাই রোজার অন্যতম লক্ষ্য : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা কাজও আচরণ থেকে বিরত হলো না, তার ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।’’ (সহীহ আল বুখারী)। ৪. চাঁদ দেখে রোজা রাখবে ও চাঁদ দেখে রোজা ভাঙবে : শা’বান মাসের ঊনত্রিশ তারিখে রমাদানের চাঁদ দেখার চেষ্টা ও ব্যবস্থা করা মুসলমানদের কর্তব্য। নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘‘চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা খতম করো। যদি ২৯ শা’বান চাঁদ দেখা না যায় তাহলে শা’বানের ত্রিশ দিন পূর্ণ করো।’’ (সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম) ৫. রোজার ফরয তিনটি : ক. নিয়্যত করা; খ. সব ধরনের পানাহার থেকে বিরত থাকা; গ. যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত থাকা। হযরত হাফসা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি ফজরের পূর্বেই রোজার সংকল্প করলো না তার রোজা শুদ্ধ হবে না।’’ (মুসনাদে আহম্দ, সুনানে আরবা’)। অন্য এক হাদীসে এসেছে : হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘‘আদম সন্তানের প্রত্যেকটি সৎ কাজের সওয়াব দশগুণ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়, কিন্তু আল্লাহ তা’আলা বলেছেন : রোজা এই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। কেননা রোজা শুধুমাত্র আমারই জন্য। অতএব, আমিই (যেভাবে ইচ্ছা) তার প্রতিফল দান করবো। রোজা পালনে আমার বান্দা আমারই সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য স্বীয় যৌন কামনা-বাসনা ও নিজের পানাহার পরিত্যাগ করে।’’ রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দ: একটি আনন্দ ইফ্তার করার সময় এবং দ্বিতীয়টি তার মালিক-মুনিব- আল্লাহ তা’আলার সাথে সাক্ষাৎলাভের সময়। আর নিশ্চিতভাবে জেনে রেখ, রোজার কারণে রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশ্কের সুগন্ধি হতেও অনেক উত্তম, আর রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখবে তখন সে যেন অপ্রয়োজনীয় ও অশ্লীল কথাবার্তা না বলে এবং চিৎকার ও হট্টগোল না করে। অন্য কেউ তাকে গালাগাল করে কিংবা তার সাথে ঝগড়া-বিবাদ করতে আসে, তখন সে যেন বলে, আমি রোজাদার।’’ (সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম) ৬. রোজা ফরয হবার শর্ত চারটি : ক. মুসলমান হওয়া; খ. বালেগা হওয়া গ. অক্ষম না হওয়া; ঘ. মহিলাদের হায়েয নেফাস থেকে পবিত্র হওয়া; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘‘তিন ব্যক্তির উপর থেকে দ্বীনি ‘ইবাদতের বাধ্যবাধকতা রহিত করা হয়েছে; পাগল ব্যক্তি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত, নিদ্রিত ব্যক্তি চেতনা-জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত ও না বালেগ কিশোর, বালেগ না হওয়া পর্যন্ত’’ (ইমাম আহমদ, আবু দাউদ, হাদীস সহীহ)। অন্য এক হাদীসে পুরুষের তুলনায় নারীদের ‘দ্বীনের অসম্পর্ণতা’ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘‘কেননা মহিলাদের হায়েয ও নেফাসের সময় নামায ও রোজা পালন করতে হয় না।’’ (সহীহ আল-বুখারী)। ৭. রোজার সুন্নাতসমূহ : ক. ভোররাতে সাহারি খাওয়া, (যার উদ্দেশ্য হবে রোজা রাখা)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমরা সাহারি খাবে, কেনান সাহারি গ্রহণের মাঝে রয়েছে বরকত।’’ (সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম)। খ. সাহারি শেষ ওয়াক্তে করা ও ইফতার প্রথম ওয়াক্তে করা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আমার উম্মত যতদিন সাহারি বিলম্ব সময়ে করবে ও ইফতার সূর্যাস্তের পরপরই জলদি করে সম্পন্ন করবে ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে।’’ (ইমাম আহমদ, হাদীসটি সহীহ) গ. ইফতারি সিক্ত নরম-খেজুর অথবা শুকনো খেজুর অথবা পানি দ্বারা করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম (রোজার সময়ে) মাগরিবের নামাযের পূর্বে তাজা, সিক্ত ও নরম-খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন, তা না পাওয়া গেলে তিনি শুকনো-খেজুর খেয়ে নিতেন, তা-ও না থাকলে কয়েক চুমুক পানি পান করে ইফতার করে নিতেন। (ইমাম তাবারানী)। ঘ. ইফতারির সময় দোয়া পড়া, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফতারের সময় এই দোয়া পড়তেন : (আল্লাহুমা লাকা ছুমতা, অ’আলা রিয্কিকা আফ্তারনা, ফাতাকববাল মিন্না ইন্নাকা আন্তাস্ ছামিউল ‘আলীম)। ‘‘হে আল্লাহ! আমরা একমাত্র আপনার জন্যই রোজা রেখেছি, আপনার রিয্ক দ্বারা ইফ্তার করেছি, সুতরাং আপনি আমাদের (রোজা ও ইফ্তারকে) কবুল করুন।’’ (সুনান-আবু দাউদ)।

৮. যে সকল কারণে রোজার কাযা ও কাফ্ফারা উভয়ই বাধ্যতামূলক : নিম্নোক্ত কারণসমূহে রোজা ভঙ্গ হলে একটি রোজার জন্য একাধারে ৬০টি রোজা রাখতে হবে এবং যে রোজার কাফ্ফারা দেয়া হবে সে রোজার কাযাও করতে হবে। সুতরাং একাধারে ৬১টি রোজা রাখতে হবে। এতে অক্ষম হলে ৬০ জন মিসকিনকে দু’বেলা পেটপুরে খাওয়াতে হবে। (রোজাদার ব্যক্তি ইচ্ছা করে পানাহার করলে)। হযরত আবু হোরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললো: ‘‘আমি রমাদানের দিনের বেলায় একদা ইচ্ছাকৃত পানাহার করেছি। (এখন আমার কাফ্ফারা হবে কিসের?) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ‘‘একজন ক্রীতদাসকে আযাদ করে দাও, অথবা একাধারে দু’মাস রোজা রাখ, অথবা ৬০ জন মিসকীনকে আহার করাও।’’ (সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম)। খ. রোজাদার ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে যৌনসঙ্গম করলে। হযরত আবু হোরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘‘একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললো : ‘‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গিয়েছি!’’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, তোমাকে কিসে ধ্বংস করলো? সে বললো : ‘‘আমি রামাদানে (দিনের বেলায়) আমার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করেছি!’’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি একটি ক্রীতদাস আযাদ করার সামর্থ্য রাখ? সে বললো, না! তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি একাধারে ২ মাস রোযা রাখতে সামর্থ্য রাখ?’ সে বললো, ‘না!’ পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি ৬০ জন মিস্কীনকে (পেটভরে) আহার করাবার সামর্থ্য রাখ?’ সে বললো, ‘না!’ অতঃপর কিছুক্ষণ সে বসে রইলো। এর পরে তিনি খেজুরের একটি থলে নিয়ে এসে বললেন, অত্র (খেজুর ভর্তি) থলেটি নাও ও তা (মিসকীনদের মাঝে) দান করে দাও, (একথা শুনে) লোকটি বললো, ‘আমাদের চেয়ে অধিক অভাবগ্রস্তকে দান করবো? আল্লাহর কসম! অত্র জনপদে এ খেজুরের প্রতি আমাদের পরিবারের চেয়ে অধিক মুখাপেক্ষী আর কেউ নেই।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে দিলেন! ও বললেন, ‘‘যাও এগুলো নিয়ে তোমার পরিবারকে খেতে দাও।’ (সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম)। ৯. রোযা ভঙ্গের কারণ এবং যার জন্যে শুধু কাযা করলেই যথেষ্ট : (ক) কুলি করার সময় হঠাৎ গলার ভিতর পানি প্রবেশ করলে। (খ) গলায়, নাকে অথবা কানে ওষুধ অথবা অন্য কোন পানীয় প্রবেশ করালে। (গ) ইচ্ছাকৃত মুখভর্তি বমি করলে। (ঘ) কাঁকর, মাটি, কাঠের টুকরা ইত্যাদি অখাদ্য খেয়ে ফেললে। (ঙ) পায়ুপথে পিচকারী বা কোন ওষুধদ্রব্য প্রবেশ করালে। (চ) পেটে বা মাথায় ওষুধ লাগানোর ফলে তার তেজ যদি পেটে বা মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। (ছ) রাত আছে মনে করে অথবা সূর্য ডুবে গেছে মনে করে খাওয়ার পর ভুল প্রমাণিত হলে। (জ) দাঁত থেকে ছোলা পরিমাণ কিছু বের করে গিলে ফেললে। (ঝ) জবরদস্তি সঙ্গম করালে বা বীর্যপাত ঘটালে।

১০. যে সকল কারণে রোযা মাকরূহ হয়, রোযা ভঙ্গ হয় না : (ক) অযুর সময় গড়গড়ার সাথে কুলি করা ও নাকের ভিতরে পানি পৌঁছানো (খ) যৌন উত্তেজনার সাথে চুম্বন করা। (গ) স্ত্রী প্রতি যৌন উত্তেজনার সাথে নজর জারি রাখা। (ঘ) সঙ্গম বিষয়ক চিন্তা কারা, (ঙ) স্ত্রীর সাথে উত্তেজনাবশত শরীর দ্বারা স্পর্শ করা বা জড়াজড়ি করা। (চ) দাঁত দ্বারা কোন কিছু এমনভাবে চিবানো যাতে তার কিছু অংশ কণ্ঠনালীর ভিতরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। (ছ) খাদ্যদ্রব্য বা কোন কিছুর স্বাদ গ্রহণ করা। (জ) অযু ছাড়া কুলি করা অথবা বিনা প্রয়োজনে মুখে পানি দেয়া। (ঝ) শরীর দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকায় শিঙা লাগানো। (ঞ) ইচ্ছাকৃত মুখে থু থু জমা করে গিলে ফেলা। (ট) মাজন, পেস্ট অথবা কয়লা চিবিয়ে দাঁত ব্রাশ করা। (ঠ) রোযা রেখে ঝগড়া, গালাগালি, গীবত ও পরনিন্দা করা। (ড) ইচ্ছাকৃত মুখের ভিতর ধুয়া অথবা ধুলাবালি গ্রহণ করা। ১১. যে সকল কারণে রোযার কোন ক্ষতি হয় না : (ক) রোযাদার ভুলবশত খানাপিনা করলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘রোযাদার ভুলে পানাহার করলে সে যেন তার ঐ দিনের রোযা পূর্ণ করে, আসলে আল্লাহই তাকে পানাহার করালেন।’ (সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম)। অন্য এক হাদীসে এসেছে, ‘যদি কেউ রামাদানে দিনের বেলায় ভুলে পানাহার করে তার উক্ত রোযার কাযা অথবা কাফ্ফারার প্রয়োজন নেই। (দারুকুতনী, হাদীস সহীহ)। (খ) রোযাদারের স্বপ্নদোষ হলে এবং গোসল ফরয হলেও কোন দোষ নেই। (গ) অধিক থুথু জমা হয়ে কণ্ঠনালীর ভিতরে গেলেও কোন ক্ষতি নেই। (ঘ) চোখে সুরমা লাগানো, শরীরে ও মাথায় তেল ব্যবহার করা অথবা খুশবু আতর লাগানোও জায়েয। (ঙ) বমি করলে যদি তার কিছু পেটে ফিরে না যায়। (চ) অনিচ্ছাকৃতভাবে মশা, মাছি গিলে ফেললে। (ছ) অনিচ্ছাকৃতভাবে পথের ধুলা, কারখানার ধোয়া ও চুলার ধোয়া মুখের ও নাকের ভিতর ঢুকে গেলে। (জ) গোসল ফরয অবস্থায় সকাল হওয়া, এমনকি দিন অতিক্রম করলেও। (ঝ) মেছওয়াক দ্বারা দাঁত ব্রাশ করলেও কোন ক্ষতি নেই। অধিক গরম লাঘবের জন্য ভিজা কাপড় গায়ে দেয়াও জায়েয।

১২. যে সকল কারণে রোযা না রাখার অনমুতি আছে : (ক) মুসাফির হওয়া; (খ) রোগগ্রস্ত হওয়া; ইসলাম মানব জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একমাত্র শান্তিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ কল্যাণকর জীবনব্যবস্থা। ইসলামী শরীয়তে এ জন্যই তার যাবতীয় হুকুম আহকামের মধ্যে মানুষের সহজ-সাধ্যতার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে। কোন ব্যাপারে তাকে অযথা কষ্ট ও সংকীর্ণতার সম্মুখীন করা হয়নি। এ ব্যাপারে রোযাদার যদি ১৫ দিনের কম সময়ের নিয়ত করে ৪৮ মাইল অথবা ৮০ কিলোমিটার দূরে সফর করে এ অবস্থাকে ‘মুসাফির’ বলা হয়, আর এ অবস্থায় তাঁকে রোযা না রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। পরে সফর থেকে ফিরে এসে ‘মুকিম’ অবস্থায় ছেড়ে দেয়া উক্ত রোযা কাযা করলেই যথেষ্ট হবে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহর ঘোষণা হলো : ‘আর যে ব্যক্তি রোগগ্রস্ত হয় বা সফরে থাকে, সে যেন অন্য দিনগুলোয় রোযার সংখ্যা পূর্ণ করে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫। অতঃপর শরীয়ত প্রণেতা বান্দার উপর এখতিয়ার দিয়েছেন যে, যদি সফর অবস্তায় কষ্টকর না হয় তবে রোযা রাখাই উত্তম; আর যদি কষ্টকর হয় তবে রোযা (সফর অবস্থায়) না রাখাই উত্তম। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গী হয়ে রামাদানে জিহাদের সফরে ছিলাম, তখন আমাদের মাঝে কিছু কিছু রোযাদার ছিলেন আবার কিছু কিছু রোযা ছাড়া ছিলেন- তাতে কোন দোষ ছিল না। অতঃপর যারা শক্তিশালী ছিলেন তাঁরা সফরেও রোযা রাখতেন, এটা তাঁদের জন্য ছিল উত্তম, আর যারা দুর্বল ছিলেন তাঁরা সফরে রোযা রাখতেন না এটাই ছিল তাদের জন্য উত্তম’। (সহীহ মুসলিম)। এ ব্যাপারে আরও মাসআলা হলো : যদি কেউ রোযার নিয়ত করার পর সফরে রওয়ানা হয়, তাহলে সেদিনের রোযা রাখা জরুরি। কিন্তু রোযা ভেঙ্গে দিলে কাফ্ফারা নেই। যদি কোন মুসাফির দুপুরের পূর্বেই কোথাও মুকীম হয়ে যায় এবং ঐ সময় পর্যন্ত রোযা নষ্ট হয় এমন কোন কাজ সে করেনি, তাহলে তাঁর জন্যও সেদিন রোযা রাখা জরুরী। কিন্তু রোযা নষ্ট করলে কাফ্ফারা দিতে হবে না। কোন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক রোজা রাখার কারণে যদি রোগ সৃষ্টি বা বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দেয় তাহলে সে অবস্থায় রোজা না রাখার অনুমতি আছে। তবে আশঙ্কামুক্ত হলে অন্য সময়ে তার কাযা আদায় করতে হবে।কোন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অথবা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিছক ধারণার ভিত্তিতে রোজা ছেড়ে দেয়া জায়েয নহে, এ অবস্থায় রোজা ছেড়ে দিলে রোজার কাফফারা আদায় করতে হবে।গ) গর্ভধারণ অবস্থা : এ অবস্থায় কোনো স্ত্রীলোকের যদি প্রবল ধারণা হয় যে, রোজার কারণে তার পেটের সন্তানের বা স্বয়ং তার নিজের ক্ষতি হবে, তাহলে তার জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে। এ অবস্থায় পরে সুস্থ হলে ছেড়ে দেয়া রোজার কাযা আদায় করতে হবে, কাফফারা দিতে হবে না(ঘ) শিশুকে স্তন্যদান : রোজা রেখে যদি প্রবল ধারণা হয় যে, স্তন্যদানে প্রসূতির ভয়ানক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা আছে-যেমন : দুধ শুকে যাবে এবং বাচ্চা ক্ষুধায় ছটফট করবে অথবা তার জীবনের আশঙ্কা দেখা দিবে, তাহলে তার রোজা না রাখার অনুমতি আছে। এতে কাযা ও কাফফারার দরকার নেই। (ঙ) অ-সমর্থ-বার্ধক্যজনিত অবস্থা : কোন ব্যক্তি যদি বার্ধক্যজনিত কারণে রোজা পালনে অ-সামর্থ হয়ে যায়, তার জন্য রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। এজন্য তার ওপর ওয়াজিব হলো সে প্রতিটি রোজার বিনিময়ে ফিদিয়া স্বরূপ একজন মিসকিনকে খাবার দিবে। আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হলো : ‘‘যাদের রোজা রাখা অত্যাধিক কঠিন তারা যেন একটি রোজার ফিদিয়া স্বরূপ একজন মিসকিনকে খাবার দেয়। (সূরা বাকারা : ১৮৫)। অর্থাৎ একজন মিসকিনকে মধ্যম মানের দুবেলা খাবার দেয়া অথবা খাবারের পরিমাণ খাদ্যশষ্য অথবা তার মূল্য প্রদান করাও যাবে। (চ) স্ত্রীলোকের মাসিক ঋতুস্রাব দেখা দিলে, ও সন্তান প্রসব হলেও নিফাসের সময় রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে কিন্তু এ সময় পরিত্যক্ত নামায কাযা করতে হয় না অথচ ছেড়ে দেয়া রোজার কাযা আদায় করতে হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘(স্ত্রীলোকদের ইবাদতের অসম্পর্ণতা) কি ইহা নয় যে, তারা যখন ঋতুস্রাবগ্রস্ত হয় তখন তারা নামাযও পড়ে না এবং রোজাও রাখে না; (সহীহ আল-বুখারী)। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন’’ ‘‘আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে ঋতুস্রাবগ্রস্ত হলে সে সময়ের ছেড়ে দেয়া রোজার কাযা করা এবং ছেড়ে দেয়া নামাযের কাযা না করার নির্দেশ দেয়া হতো।’’ (সহীহ আল-বুখারী)। (ছ) অধিক বয়সি, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারিনী স্ত্রীলোকদের রোজা না রাখার অনুমতি ফিদিয়া দেয়ার সাপেক্ষে দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহর বাণী: ‘‘যারা (বার্ধক্য জনিত কারণে) রোজা রাখতে অতি কষ্টের সাথে সমর্থ, এ দরিদ্র ব্যক্তির খাবার বিনিময় মূল্য হিসেবে দেয়া তাদের কর্তব্য ‘‘(সূরা বাকারা: ১৮৪)। এ সম্পর্কে হযরত ইবন আববাস (রা.) বলেছেন: ‘‘থুরথুরে বৃদ্ধ ও খুব বেশি বয়সের বৃদ্ধার জন্য রোজা রাখতে সামর্থবান হওয়া সত্ত্বেও এ সুবিধাদান করা হয়েছে যে, তারা দু’জন রোজা না রাখার অনুমতি পাবে, তবে তারা প্রতেকদিন রোজার পরিবর্তে একজন গরিব ফকীর ব্যক্তিকে খাওয়াবে। এর সাথে গর্ভবতী স্ত্রীলোক ও স্তন্যদান কারিনী এ দু’জন যদি তাদের সন্তানদের ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ করে, তবে তারাও রোজা না রাখার অনুমতি পাবে ও সাথে সাথে মিসকিনকে খাবার দিবে, ’’(সুনানে আবিদাউদ)। রামাদানের রোজার বিকল্প নেই : হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি শরীয়তসম্মত কোনো কারণ ছাড়াই রমাদান মাসের একটি রোজা ছেড়ে দিলো সে যদি তা পূরণের জন্য সারাজীবন রোজা রাখে তা হলেও ঐ একটি ফরয রোজার হক আদায় হবে না। (সুনানে তিরমিযী ও আবি দাউদ) হাদীসে আরও বলা হয়েছে, যে, ‘‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও হিসাব নিকাশ করে আল্লাহ ভীতির সাথে রামাদানের রোজা রাখবে তার পূর্বকৃত যাবতীয় অপরাধসমূহ ক্ষমা করা হবে।’’ (সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম)। অতএব রোজার মাসয়ালা ও মাসায়েল সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগত হয়ে মহান রাববুল আলামীনের ‘তাকওয়া’ অর্জনের লক্ষ্যে মুমিন জীবনের প্রতি বছর পূর্ণ রামাদান মাস সিয়াম সাধনার অতিবাহিত হয়। আল্লাহর ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরয করা হয়েছে যেমনি ফরয করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে সক্ষম হও।’’ (সুরা রাকারাহ : ১৮৩)।প্রতি বছর পবিত্র রামাদানে দুনিয়ার মুসলিমগণ নিয়মিত রোজার সাধনা করা সত্ত্বেও তারা তাকওয়া অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে কেন? কারণ মুমিনদের জীবনে নৈতিক ও আন্তরিকভাবে সৎ-অনুশীলনের অভাব, অর্থ উপার্জনে হারাম পথও পন্থা পরিহার করে হালাল পথে না চলা, ইসলাম নির্দেশিত হারাম পন্থা যেমন-ধোকাবাজি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সুদ, ঘুষ, মাপে কম দেয়া ও মাপে বেশি নেয়া, ভেজাল মিশিয়ে প্রতারণা করা, অপরের অধিকার আত্মসাৎ করা, যুলুম করা ইত্যাদির মাধ্যমে অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়ে তোলার প্রতিযোগিতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে শরীর হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থের খাদ্য দ্বারা তৈরি হয়েছে সে শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সুনানে তিরমিযী)। আল্লাহ আমাদেরকে পবিত্র রোজার মাধ্যমে তার তাকওয়া অর্জনের তৌফিক দিন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আরবী বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *