নবীজি যে কারণে ‘ইয়া আবা হামযা’ বলে ডাকতেন এক সাহাবীকে

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী, খাদিমে রাসূল, ইমাম, মুফতী, মু’য়াল্লিমে কুরআন, মুহাদ্দিস, খ্যাতিমান রাবী, আনসারী, খাযরাজী ও মাদানী। কুনিয়াত আবু সুমামা ও আবু হামযা। খাদিমু রাসূলিল্লাহ লকব বা উপাধি। (দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়া- ৩/৪০২, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৪) আনাস বলতেনঃ আমি ‘হামযা’ নামক এক প্রকার সব্জী খুটতাম, তাই দেখে রাসুল সা. আদর করে আমাকে ডাকেনঃ ‘ইয়া আবা হামযা’। সে দিন থেকে এটাই আমার কুনিয়াত বা ডাকনাম হয়ে যায়। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪১) ইয়াসরিবের (আল-ইসাবা- ১/৭১) বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখায় হিজরাতের দশ বছর পূর্বে ৬১২ খ্রীস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করে। (আল-আ’লাম- ১/৩৬৫, আল-ইসাবা- ১/৭১) এই গোত্রটি ছিল আনসারদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত। আনাসের পিতা মালিক ইবন নাদর এবং মাতা উম্মু সুলাইম সাহলা বিনতু মিলহান আল-আনসারিয়্যা। উম্মু সুলাইম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর সা. খালা হতেন। রাসূলুল্লাহর সা. দাদা আবদুল মুত্তালিবের মা সালমা বিনতু ’আমর-এর নসব ’আমির ইবন গানাম- এ গিয়ে আনাসের মার বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। (উসুদুল গাবা- ১/১২৭, আসাহহুস সীয়াব- ৬০৬) উম্মু সুলাইমের আসল নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। যেমনঃ সাহলা, রুমাইলা, রুমাইসা, সুলাইকা, আল-ফায়সা ইত্যাদি। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৪০)

আনাসের চাচা আনাস ইবন নাদর উহুদ যুদ্ধে শহীদ হন। কাফিররা কেটে কুটে তাঁর দেহ বিকৃত করে ফেলেছিল। তাঁর দেহে মোট আশিটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তাঁর এক বোন ছাড়া আর কেউ সে লাশ সনাক্ত করতে পারেনি। আনাস বলতেন, আমার এই চাচা আনাসের নামেই আমার নাম রাখা হয়েছিল। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৮৩, হায়াতুস সাহাবা- ১/৫০৪, ৫০৫) আনাসের মামা হারাম ইবন মিলহান বি’রে মা’উনার দুঃখজনক ঘটনায় শাহাদাত বরণ করেন। (দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ৩/৪০২) আনাসের বয়স যখন আট/নয় বছর তখন তাঁর মা ইসলাম গ্রহণ করে। এ কারণে তাঁর পিতা ক্ষোভ ও ঘৃণায় শামে চলে যায় এবং সেখানে কুফরী অবস্থায় মারা যায়। মা আবু তালহাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। আবু তালহা ছিলেন খাযরাজ গোত্রের একজন বিত্তশালী ব্যক্তি। মা বালক আনাসকেও সাথে করে আবু তালহার বাড়ীতে নিয়ে যান। আনাস এখানেই প্রতিপালিত হন। আবু তালহার সাথে তাঁর মার বিয়ে সম্পর্কে আনাস বর্ণনা করেছেনঃ আবু তালহা যখন উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। উম্মু সুলাইম বললেনঃ আবু তালহা, তুমি কি জাননা, যে ইলাহ-র ইবাদাত তুমি কর তা মাটি দিয়ে তৈরী? বললেনঃ হাঁ, তা জানি। উম্মু সুলাইম আরও বললেনঃ একটি গাছের ইবাদাত করতে তোমার লজ্জা হয় না? তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর, তোমাকে বিয়ে করতে আমার আপত্তি নেই এবং তোমার কাছে কোনমোহরের দাবীও আমার থাকবে না। ‘আমি ভেবে দেখবো’- এ কথা বলে আবু তালহা উঠে গেলেন। পরে ফিরে এসে তিনি উচ্চারণ করলেনঃ ‘আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ- আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তখন উম্মু সুলাইম ছেলে আনাসকে ডেকে বললেনঃ আনাস, তুমি আবু তালহার বিয়ের কাজটি সমাধা কর। আনাস তাঁর মাকে আবু তালহার সাথে বিয়ে দিলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/১৯৫, ১৯৬) মদ হারাম হওয়ার পূর্বে আবু তালহার বাড়ীতে মদ পানের আসর বসতো। বালক আনাস সেই আসরে সাকীর দায়িত্ব পালন করতেন এবং নিজেও মদের অভ্যাস করতেন। এই বালককে মদ পান থেকে বিরত রাখার কেউ ছিল না। (মুসনাদ- ৩/১৮১) আনাসের বয়স যখন আট/নয় বছর তখন মদীনায় ইসলামের প্রচার শুরু হয়ে যায়। ইসলাম কবুলের ব্যাপারে বনু নাজ্জার গোত্র সবার আগে ভাগেই ছিল। এই খান্দানের বেশীর ভাগ সদস্য রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় আসার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। আনাসের মা উম্মু সুলাইম ও তৃতীয় আকাবার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। পূর্বেই বলা হয়েছে উম্মু সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করায় তাঁর স্বামী অর্থাৎ আনাসের পিতা স্ত্রী ও সন্তান ত্যাগ করে শামে চলে যায়। স্বামী পরিত্যক্তা উম্মু সুলাইম আবু তালহাকে বিয়ে করতে রাজী হন এই শর্তে যে, তিনিও ইসলাম গ্রহণ করবেন। এভাবে উম্মে সুলাইমের চেষ্টায় আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করে মক্কায় যান এবং তৃতীয় ’আকাবায় শরীক হয়ে রাসূলুল্লাহর হাতে সা. বাইয়াতের গৌরব অর্জন করেন। এভাবে আনাসের বাড়ী ঈমানের আলোয় আলোকিত হয়ে যায়। তাঁর জান্নাতী মা উম্মু সুলাইম ইসলামের এক আলোক বর্তিকা, আর তাঁর স্বামী দ্বীনের এক নিবেদিত প্রাণ কর্মী। এমনই এক আশ্রয়ে আনাস বেড়ে ওঠেন। আনাস যখন দশ বছরের বালক তখন হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় আসেন। আনাসের বয়স অল্প হলেও তিনি খুবই উৎসাহী ছিলেন। রাসুল সা. যখন কুবা থেকে মদীনার দিকে আসছিলেন, সমবয়সী ছোট ছেলে-মেয়েদের সাথে পথের পাশে দাঁড়িয়ে আনাসও স্বাগত সংগীত গেয়েছিলেন, তাঁরা ছুটে ছুটে ‘রাসূলুল্লাহ এসেছেন, মুহাম্মাদ এসেছেন’- বলে মদীনাবাসীদের ঘরে ঘরে রাসূলুল্লাহর সা. আগমন বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। এক সময় রাসূলুল্লাহর সা. পাশ থেকে ভীড় একটু কম হলে আনাস তাঁর চেহারা মুবারকে প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং সাহাবিয়্যাতের মর্যাদা লাভে ধন্য হন। হযরত রাসূলে কারীম সা. যখন মদীনায় আসেন প্রসিদ্ধ মতে আনাসের বয়স তখন দশ বছর। রাসুল সা. একটু স্থির হওয়ার পর আনাসের মা একদিন তাঁর হাত ধরে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে নিয়ে যান। এ সম্পর্কে আনাস বলেনঃ আমার মা আমার হাত ধরে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে নিয়ে গিয়ে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আনসারদের প্রত্যেক নারী-পুরুষ আপনাকে কিছু না কিছু হাদিয়া দিয়েছে। আমি তো তেমন কিছু দিতে পারছিনে। আমার এই ছেলেটি আছে, সে লিখতে জানে। এখনও সে বালেগ হয়নি। আপনি একেই গ্রহণ করুন। সে আপনার খিদমাত করবে। সেই দিন থেকে আমি একাধারে দশ বছর যাবত রাসূলুল্লাহর সা. খিদমাত করেছিল। এর মধ্যে কখনও তিনি আমাকে মারেননি, গালি দেননি, বকাঝকা করেননি এবং মুখও কালো করেননি। তিনি সর্বপ্রথম আমাকে এই অসীয়াতটি করেনঃ ছেলে, তুমি আমার গোপন কথা গোপন রাখবে। তা হলেই তুমি ঈমানদার হবে। আমার মা এবং রাসূলুল্লাহর সা. সহধর্মিনীগণ কখনও আমার কাছে রাসূলে সা. গোপন কথা জিজ্ঞেস করলে, বলিনি। আমি তাঁর কোন গোপন কথা কারও কাছে প্রকাশ করিনি। অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আবু তালহা তাঁকে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট নিয়ে যান। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪১, আনসাবুল আশরাফ- ১/৫০৬, আল-ইসাবা- ১/৭১) হযরত আনাস রাসূলুল্লাহর সা. জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় দশ বছর অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে তাঁর খিদমাতের দায়িত্ব পালন করেন। এ জন্য তাঁর গর্বের শেষ ছিল না। ফজর নামাযের পূর্বেই তিনি রাসূলুল্লাহর সা. খিদমাতে হাজির হয়ে দুপুরে বাড়ী ফিরতেন। কিছুক্ষণ পর আবার আসতেন এবং আসরের নামায আদায় করে বাড়ী ফিরতেন। আনাসের মহল্লায় একটি মসজিদ ছিল, সেখানে মুসল্লীরা তাঁর অপেক্ষায় থাকতো। তাঁকে দেখে তারা আসরের নামাযে দাঁড়াতো। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/২২২) উপরোক্ত সময় ছাড়াও তিনি সব সময় রাসূলুল্লাহর সা. যে কোন নির্দেশ পালনের জন্য প্রস্তুত থাকতেন। যখনই প্রয়োজন পড়তো রাসূলুল্লাহর সা. ডাকে সাড়া দিতেন। এক দিনের ঘটনা, তিনি রাসূলুল্লাহর সা. প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দুপুরে বাড়ীর দিকে চলেছেন। পথে দেখলেন, তাঁরই সমবয়সী ছেলেরা খেলছে। তাঁর কাছে খেলাটি ভালো লাগলো। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন তাদের খেলা দেখতে। কিছুক্ষণ পর দেখলেন, রাসূল সা. তাদের দিকে আসছেন। তিনি এসে প্রথমে ছেলেদের সালাম দিলেন, তারপর আনাসের হাতটি ধরে তাঁকে কোন কাজে পাঠালেন। আর রাসূল সা. তাঁর অপেক্ষায় একটি দেয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। আনাস কাজ সেরে ফিরে এলে রাসুল সা. বাড়ীর দিকে ফিরলেন, আর তিনি চললেন বাড়ীর দিকে। ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় তাঁর মা জিজ্ঞেস করলেন, এত দেরী হলো কেন? তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. একটি গোপন কাজে গিয়েছিলাম। এই জন্য ফিরতে দেরী হয়েছে। মা মনে করলেন, ছেলে হয়তো সত্য গোপন করছে, এই জন্য জানতে চাইলেনঃ কী কাজ? আনাস জবাব দিলেন একটি গোপন কথা, কাউকে বলা যাবেনা। মা বললেনঃ তাহলে গোপনই রাখ কারও কাছে প্রকাশ করোনা। আনাস আজীবন এ সত্য গোপন রেখেছেন। একবার তাঁর বিশিস্ট ছাত্র সাবিত যখন সেই কথাটি জানতে চাইলেন তখন তিনি বললেন, কথাটি কাউকে জানালে তোমাকেই জানাতাম। কিন্তু আমি তা কাউকে বলবো না। (আল-ফাতহুর রাব্বাবী মা’য়া বুলুগুল আমানী- ২২/২০৪, হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৪৩, ২/৫০৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *