দাসী থেকে নবীজির স্ত্রী সাফিয়্যা (রা.) জানুন সেই রিদয় বিদারক ঘটনা

আপনাদের কি মনে আছে ওই ঘটনার কথা। এক যুদ্ধে মুসলমান সৈন্যরা জয়ের দেখা পাচ্ছিল না। রাসুল (সা.) এশার নামাজ পড়ে বললেন, “আগামীকাল সকালে এমন একজনের হাতে ‘জুলফিকার’ তুলে দেব, যার বীরত্বের বরকতে আমরা যুদ্ধে জয়লাভ করব।” সকালে হজরত আলী (রা.) এর হাতে রাসুল (সা.) ‘জুলফিকার’ তুলে দেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তলোয়ার ভেঙে গেলে আলী (রা.) কামুস দুর্গের বিশালাকৃতির লোহার দরজা হাতে নিয়ে যুদ্ধ করেন। মুসলমানদের বিজয় নিশ্চিত হয়। এখন নিশ্চয়ই মনে পড়েছে। ঠিক ধরেছেন, খায়বরের যুদ্ধের কথাই বলছি। সপ্তম হিজরি সনে সংঘটিত এ যুদ্ধে মুসলমানরা শুধু বিজয় অর্জনই করেনি, অনেক গনিমতও পেয়েছিল। এত বেশি গনিমত এর আগে কোনো যুদ্ধে পাওয়া যায়নি। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘খায়বরে এত বেশি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আমাদের আয়ত্তে এসেছে যে, আমরা বলাবলি করছিলাম, এবার থেকে পেট ভরে খেজুর খাওয়ার দিন এসেছে।’ (বোখারি : ৩/৬০৯)। এ যুদ্ধে অসংখ্য গনিমত লাভের সঙ্গে অনেক যুদ্ধবন্দিও মুসলমানদের হাতে আসে। হজরত দাহিয়াতুল কালবি (রা.) রাসুল (সা.) কে বলেন, ‘আমার কোন দাসী নেই। দয়া করে আমাকে একটি দাসী দিন।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘এসব যুদ্ধবন্দি মহিলাদের থেকে তোমার যাকে পছন্দ তাকে নিয়ে নাও।’ তিনি পছন্দ করলেন জয়নব নামের এক রূপবতী মহিলাকে। দাহিয়াতুল কালবির সঙ্গে জয়নবকে দেখে একদল সাহাবি রাসুল (সা.) এর কাছে এসে বললেন, ‘দাহিয়া (রা.) যাকে পছন্দ করেছে সে বনু নাজির ও বনু কোরায়জার নেত্রী। সে শুধু আপনারই উপযুক্ত। আপনার উপযুক্ত হওয়ার বড় কারণ হলো, সে হজরত ইবরাহিম (আ.), ইসহাক, ইয়াকুব, হারুন ও ইমরান (আ.) এর বংশধর।’ রাসুল (সা.) এ পরামর্শটা আমলে নিলেন। দাহিয়া (রা.) ও ওই দাসীকে ডেকে আনলেন। দাহিয়াকে বললেন, তুমি অন্য দাসী বেছে নাও। আর জয়নবকে আমার কাছে বিক্রি করে দাও। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা থেকে জানা যায়, সাতজন যুদ্ধবন্দির বিনিময়ে রাসুল (সা.) জয়নবকে কিনে নেন। (মুসলিম : ১৩৬৫)।

জয়নবকে রাসুল (সা.) ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে রাসুল (সা.) তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। তার মোহর হিসেবে তাকে দাসের জীবন থেকে মুক্ত করে দেন। মুক্তি এবং রাসুল (সা.) এর পতœী এ দুই আনন্দই একসঙ্গে ধরা দেয় তার জীবনে। আরেকটি পরিবর্তন আসে আম্মাজান জয়নবের জীবনে। আরবের নিয়ম ছিল যুদ্ধবন্দি নারীদের মধ্যে যারা রাজা-বাদশাহর ভাগে পড়ত তাদের ‘সাফিয়্যা’ বলা হতো। আর এভাবেই আম্মাজান সাফিয়্যা নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যান। (সিয়ারু সাহাবিয়াত : ৮১)। আম্মাজান যে রাসুল (সা.) এর বিবি হবেন সেটা তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। এ ঘটনার কয়েকদিন আগে তিনি স্বপ্নে দেখেন, আকাশে ভরা পূর্ণিমা। হঠাৎ চাঁদটা তার কোলে এসে পড়ল। ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠলেন। কী ব্যাখ্যা এ স্বপ্নের? মাকে জিজ্ঞেস করলেন। মা সজোরে এক চড় বসিয়ে দিলেন গালে। বললেন, ‘তোর তো সাহস কম নয়। আরবের বাদশাহ মুহাম্মদের দিকে নজর দিয়েছিস।’ রাসুল (সা.) এর সঙ্গে বিয়ের সময়ও গালে চড়ের দাগ ছিল। রাসুল (সা.) এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি স্বপ্নের ঘটনাটি বলেন। (ইবনে হিশাম : ২/৩৩৬)। আম্মাজানের জন্ম সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। তবে তিনি নেতৃত্বস্থানীয় বংশের মহিলা ছিলেন। আগেই বলেছি, তিনি নবীবংশের মহিলা। তার পিতা হুয়াই বিন আখতার ছিল বিখ্যাত ইহুদি গোত্র বনু নাজিরের সন্তান। আর মা বাররা বিনতে সামওয়াল ছিলেন বনু কুরাইজার সন্তান। দাদা ও নানা উভয়ই ছিলন নিজ নিজ গোত্রের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। রাসুল (সা.) এর সঙ্গে বিয়ের আগে তিনি বিখ্যাত ইহুদি কবি সালাম ইবনে মাশকামের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। এ বিয়ে বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সালামের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলে কিনান ইবনে আবু হুকাইকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিনানও বড় কবি ছিলেন। খায়বরের যুদ্ধে স্বামী কিনান নিহত হন। আর আম্মাজানের ভাগ্য প্রসন্ন হয়। আসলে এ যে সব আসমানেরই ইশারা ছিল তা অস্বীকারের উপায় কী? (আসাহ হুসসিয়ার : ২৩৭)।

আম্মাজান সাফিয়্যার বিবাহের আনন্দ আরও আনন্দঘন হয়ে ওঠে সব সাহাবির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। যার কাছে যা ছিল তাই নিয়ে এসেছেন রাসুল (সা.) এর সামনে। সব একত্রে জমা করে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়। এটা ছিল আম্মাজানের বিবাহের ওলিমা। বাসর রাতে ঘটে এক আজব ঘটনা। আম্মাজান ও রাসুল (সা.) তাঁবুর ভেতর অবস্থান করছিলেন। নবীপাগল আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) সারা রাত কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ফজরের সময় রাসুল (সা.) তাকে দেখে বললেনÑ ‘আবু আইয়ুব! তুমি ঘুমাওনি?’ ‘জি না, আল্লাহর নবী (সা.)।’ ‘কেন?’ ‘আমার ভয় হচ্ছিল আপনার কোনো বিপদ হতে পারে।’ ‘কী ধরনের বিপদ।’ ‘সাফিয়্যা, যিনি আপনার সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী। তিনি একজন ইহুদি রমণী। যুদ্ধে স্বামী ও স্বজনদের হারিয়েছে। না জানি তার অন্তরে শয়তানের পক্ষ থেকে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে। আপনার কোনো ক্ষতি হয়ে যায়। এ শঙ্কায় আমি সারা রাত আপনার তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।’ রাসুল (সা.) এ কথা শুনে মুচকি হেসে দিলেন। তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। (আসাহ হুসসিয়ার : ৬৪৬)। আরেক দিনের ঘটনা। রাসুল (সা.) ঘরে এসে শুনছেন, আম্মাজান সাফিয়্যা কাঁদছেন। ‘ব্যাপার কী সাফিয়্যা! তুমি কাঁদছ কেন?’ ‘আপনার অন্যান্য বিবিরা আমাকে ইহুদি বংশের বলে হেয় করছে।’ ‘তাতে কী? তুমি তাদের বলে দেবে আমার বাবা হারুন। আমার চাচা মুসা। আর আমার স্বামী মুহাম্মদ। ব্যস! তোমার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হয়ে যাবে।’ রাসুল (সা.) এর সমাধান পেয়ে আম্মাজান হেসে ফেললেন। সুবহানাল্লাহ! কত বিচক্ষণতার সঙ্গেই না পারিবারিক খুঁটিনাটি বিরোধ মীমাংসা করতেন রাসুল (সা.)। (তিরমিজি : ৩৮৯২)। ইহুদি গোত্রের হওয়ার কারণে অনেকে আম্মাজানকে হেয় করার চেষ্টা করতেন। যার থেকেই এ আচরণ প্রকাশ পেত তার সঙ্গেই রাসুল (সা.) কঠোর রাগ করতেন। একবার আরেক আম্মাজান হজরত জয়নব বিনতে জাহাশ (রা.) আম্মাজান সাফিয়্যাকে ইহুদি মহিলা বলে সম্বোধন করেন। রাসুল (সা.) শুনে খুব রাগ হলেন। দীর্ঘ তিন মাস জয়নব (রা.) এর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ রাখেন। আরেকবার আয়েশা (রা.) আম্মাজানের দৈহিক গঠন সম্পর্কে কথা বললে রাসুল (সা.) বললেন, ‘আয়েশা! তুমি এমন একটি কথা বলেছ যা সাগরে ছেড়ে দিলে পুরো পানি ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত করে দেবে।’ (সিয়ারু আলামিন নুবলা : ২/২৩৫)। অন্যান্য আম্মাজানের মতো সাফিয়্যা (রা.)ও ছিলেন জ্ঞান ও মারেফাতের কেন্দ্র। তার কাছে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী এলমে হাদিস ও ফিকহ শিখতে আসত। তিনি মোট ১০টি হাদিস বর্ণনা করেন। যার ৯টিই বোখারি ও মুসলিমে মুত্তাফাকুন আলাই হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। তার থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, ইমাম জয়নুল আবেদিন, ইসহাক ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে হারিস, মুসলিম ইবনে সাফওয়ান, কিনান ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মুআত্তাব প্রমুখ। (আল ইসাবা : ৪/৩৪৭)। মোমিনদের জননী হজরত সাফিয়্যা (রা.) হিজরি ৫০ হিজরি সনে ৬০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। হজরত সাদ ইবনে আস তার জানাজা পড়ান। কোনো কোনো জীবনীকার হজরত মুআবিয়া (রা.) তার জানাজা পড়ান বলে উল্লেখ করেছেন। (আনসাবুল আশরাফ : ১/১৪৪)। মৃত্যুর সময় আম্মাজান অসিয়ত করেন তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ যেন তার বোনের ছেলেকে দেয়া হয়। বোনের ছেলে ছিল ইহুদি। তাই অনেকে অসিয়ত বাস্তবায়নে গড়িমসি করতে লাগলেন। লোকদের এ অবস্থা দেখে আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর ভয় করো। সাফিয়্যার অসিয়ত পূর্ণ করো। (তাবাকাত : ৮/১২৮)। এই আর্টিকেলটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *