খ্রিষ্টান রাজকন্যা বললেনঃ একজন মুসলমানও তার প্রতি আকর্ষিত হচ্ছে না! যেখানে খ্রিষ্টানদের মাঝে তাকে নিয়ে যুদ্ধ বেধে যেতো

খ্রিষ্টান রাজকন্যা বললেনঃ একজন মুসলমানও তার প্রতি আকর্ষিত হচ্ছে না! যেখানে খ্রিষ্টানদের মাঝে তাকে নিয়ে যুদ্ধ বেধে যেতো। এই অকল্পনীয় দৃশ্য দেখে জার্জিস কন্যা হেলেন হযরত উসমান রাঃ কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন আমাকে আগে মুসলমান করুন এবং তারপর আমাকে উনার সাথে বিবাহ দিন যে আমার বাবাকে হত্যা করেছে, এতে আমার কোন আপত্তি নেই। ঘটনাটী ছিলো এরকমঃ

হযরত উসমান রাঃ এর খলিফা সময়ে আফ্রিকার রাজা জার্জিস এর সাথে যুদ্ধ চলা কালিন আফ্রিকার রাজা ঘোষনা করেন যে বীর যোদ্ধা মুসলিম সেনাপতির মুন্ডূ এনে দিতে পারেবে তাকে তার মেয়ের (রাজকুমারি হেলেন, ঐ সময়ে যার সৌন্দর্যের সাথে অন্য কারো তুলনাই করা চলতো না) সাথে বিয়ে দেবে। এ কথা শুনে আফ্রিকান সৈন্যরা তীব্রভাবে লড়াই করতে থাকে। পক্ষান্তরে খবরটি মুসলিম সেনাপতির কানেও চলে যায়, এবং সৈন্যদের মধ্যে জোশ ফিড়িয়ে আনতে তিনিও ঘোষনা করেন যে, যে বীর বাহাদুর আফ্রিকান রাজা জার্জিস এর মুন্ডু এনে দিতে পাড়বে তাকে জার্জিসের কন্যা হেলেনের সাথে বিয়ে দেওয়া হবে এবং একলক্ষ সর্নমুদ্রা পুরষ্কিত করা হবে। এল বীর বাহাদুর জার্জিসের শির ছিন্ন করে দেয় তার কন্যার সামনেই। যুদ্ধ শেষ হলো, আফ্রিকার রাজার ছিন্ন শির পাঠানো হলো খলিফার দরবারে এবং সেই সাথে তার মেয়েকেও বন্দি হিসেবে পাঠানো হলো মুসলিম খলিফার দরবারে, মুসলিম সেনাপতি, মুসলিম জাহানের খলিফা হযরত উসমান রাঃ এর কাছে একটি চিঠি লিখেন যার ভাষা ছিলোঃ

“আব্দুল্লাহ ইবনে সা’আদের পক্ষ থেকে আমীরুল মুমেনীন, খলীফাতুল মুসলেমীন হযরত উসমান ইবনে আফফান রাযি. এর খেদমতে। হামদ ও সালাতের পর, আল্লাহ পাক মেহেরবানী করে মুসলমানদের বিরাট সফলতা দান করেছেন। আফ্রিকার শাহানশাহ জার্জিস যুদ্ধের ময়দানে নিহত হয়েছেন। তার সুন্দরী কন্যা শাহজাদী হেলেনও বন্দী হয়েছেন। তাকে নিয়ে একটি ঘটনা এই ঘতেছে যে, তার পিতা জার্জিস ঘোষণা দিয়েছিলেন—যে বীরপুরুষ মুসলিম সেনাপতির মাথা কেটে আনতে পারবে, শাহজাদীকে তার হাতে তুলে দেওয়া হবে। অতঃপর ইবনে যুবাইরের পরামর্শে আমি মুজাহিদদের মাঝে এই ঘোষণা করে দেই যে, যে বীর-বাহাদুর রাজা জার্জিসকে কতল করে তার ছিন্ন মস্তক আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবে, শাহজাদী হেলেনকে তার নিকট বিয়ে দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে সে পাবে আরো একলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা। আমীরুল মুমেনীন! যুদ্ধেক্ষেত্রে কোনো এক মুজাহিদ রাজা জার্জিসকে হত্যা করেছে। আমরা তাকে খুঁজে বের করে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়েছি। পুরুস্কার গ্রহণ করার জন্য কেউ আসেনি। অবশেষে শাহজাদী ও তার সাথীদেরকে আপনার খেদমতে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি যা ভাল মনে করেন তাই করবেন। ওয়াদা মুতাবেক একলক্ষ দিনারও গনীমতের মালের সঙ্গে দিয়ে দিলাম।”

চিঠির বক্তব্য শুনে উপস্থিত লোকজন অবাক। সত্যিই এমন ঘটনা খুব কমই শোনা যায়। সবার মনে এখন একই জিজ্ঞাসা—কে সেই মহান ব্যক্তি? যিনি নিজের কৃতিত্বকে এভাবে গোপন করেছেন। এত দামী পুরস্কারকেও তুচ্ছ ভেবেছেন। এতো বড় ত্যাগ…এতো বড় আত্মবলি কেন দিচ্ছেন তিনি?

ব্যাপারটা জানার জন্য উসমান রাঃ এবার শাহজাদী হেলেনকে দরবারে ডেকে পাঠালেন এবং তার উদ্দেশ্যে বললেনঃ শাহজাদী! আমি তোমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তি দিয়ে দিতাম। কিন্তু এক মুশকিল দেখা দিয়েছে। মুসলিম সেনাবাহিনীর সিপাহসালার ঘোষণা করেছিলেন—যে ব্যক্তি আফ্রিকার রাজাধিরাজকে হত্যা করবে, তার নিকট আফ্রিকার শাহজাদীকে দুলহানস্বরূপ পুরস্কার প্রদান করা হবে। কাজেই মা! তুমি এখন সেই বীর পুরুষের, যিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। এতে আমাদের আর কিছু করার নেই।

কিন্তু তিনি কোথায়? সিপাহসালার বারবার ঘোষণা করার পরও আমার পিতাকে হত্যা করার দাবী যে তিনি পেশ করছেন না? কথাটি হেলেন বলে ওঠেন একেবারে নিঃসঙ্কোচে, যেন এতে তার কোন আপত্তি নেই। বরং তাঁকে এখনো না পাওয়ার জন্য তিনি দুঃখিত।

হযরত উসমান রাযি. বললেন—হ্যাঁ, মুসলমানদের স্বভাব-প্রকৃতি আমি জানি। আমার ধারণা হচ্ছে, তোমার পিতার হত্যাকারী এজন্য আত্মগোপন করেছেন যে, লোকজন তাঁর সীমাহীন প্রশংসা শুরু করবেন; যা তিনি পছন্দ করেন না।

এতটুকু বলে হেলেনকে উদ্দেশ্য করে খলীফা বললেন—আচ্ছা মা! তুমি কি আমাদের কিছুটা সাহায্য করতে পারবে?

হেলেন সোৎসাহে বললেন—বলুন, আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব।
তুমি বোধহয় তোমার পিতার হত্যাকারীকে দেখেছ?
জি, ভালো করেই দেখেছি। এখনও লোকটি আমার চোখে ভাসছে।
দেখলে চিনতে পারবে?
খুব চিনতে পারবো। দেখলেই চিনতে পারবো।
তবে তুমি এক কাজ করো। এখানে যারা উপস্থিত আছে, এদের প্রথম দেখা নাও, পরে অন্যদের আনা হবে।

এতক্ষণ যাবত হেলেন মজলিসের অন্য কোনো দিকে চোখ ফিরে তাকাননি। একমাত্র উসমান রাযি. এর চেহারার দিকে চেয়েই কথা বলছিলেন। এখন দেখবার আদেশ পেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। চারিদিকে ঘাড় মুড়িয়ে এক এক করে মুখগুলো নিরীক্ষণ করে চললেন।

এতক্ষণে অন্যান্য মুজাহিদদের সাথে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. ও মদীনায় ফিরে এসেছেন। এবং ইতোমধ্যেই অন্যান্যদের সাথে মিশে উপস্থিত হয়েছেন খলীফাতুল মুসলেমীনের দরবারে। হেলেন তাঁকে চিনে ফেলবে এই আশঙ্কায় তিনি হাঁটুতে মাথা গুজে নীচের দিকে চেয়ে বসেছিলেন।

শাহজাদী সবাইকে গভীরভাবে লক্ষ্য করে যাচ্ছেন। হঠাৎ তাঁর নজর পড়ল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি.-এর উপর। তাই সাথে সাথে তিনি বললেন—এই তো তিনি। তিনিই আমার পিতার হত্যাকারী। এ কথা বলে শাহজাদী খলীফার দিকে তাকালেন।

সকলের দৃষ্টি এখন তখন আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরের প্রতি নিবদ্ধ। হেলেনও আড় চোখে দেখতে লাগলেন তাঁকে। তাঁর মুখে স্মিত হাসি। চেহারায় ফুটে উঠেছে পুলক স্পন্দন।

উসমান রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, ইবনে যুবাইর! তুমিই কি শাহানশাহ জার্জিসকে হত্যা করেছ?

লজ্জায় ইবনে যুবাইরের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। এত চেষ্টা করেও তিনি আত্মগোপন করতে পারলেন না। মনে মনে ভাবছেন তিনি—কর্তব্য ছিল, সুযোগ পেয়েছি, তা সম্পাদন করেছি। ব্যস এখানেই শেষ। এই নিয়ে আবার হৈচৈ কেন? এসব তো ভাল লাগছে না। কিন্তু এখন কি করা যায়? মুসলমান তো মিথ্যা বলতে পারে না। নইলে হয়তো অস্বীকিয়ার করে বসতেন। অগত্যা বললেন, জ্বি-হ্যাঁ।

কিন্তু ইবনে যুবাইর! আমার প্রশ্ন হলো, পুরস্কার গ্রহণের জন্য সেনাপতির আহবানে তুমি সাড়া দিলে না কেন? বললেন হযরত উসমান রাযি.।

ইবনে যুবাইর ধীর অথচ গম্ভীর স্বরে বললেন, আমীরুল মু’মিনীন! দু’টি কারণে আমি নিজকে প্রকাশ করি নি। প্রথমতঃ আমি কোনো পুরস্কারের আশায় বা লোভে পড়ে রাজা জার্জিসকে হত্যা করি নি। ইসলামের প্রত তাঁর শত্রুতা আমার তলোয়ারকে উদ্যত করেছিল। আল্লাহর শোকর, ইসলাম ও মুসলমানদের ক মস্তবড় দুশমনকে আমি হত্যা করতে পেরেছি। কিন্তু আমি যদি আত্মপ্রকাশ করতাম তবে সবাই বলতো যে, নিশ্চয়ই অপরূপ সুন্দরী শাহজাদীকে পাওয়ার আশায় কিংবা বিপুল অর্থ লাভের জন্যই আমি তাঁর পিতাকে হত্যা করেছি। অথচ আমি নিশ্চিত জানি, এখনও বুকে রেখে বলছি—আল্লাহর কসম আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশী ছিলাম—কোনো সুন্দরী যুবতীর নয়। নয় কোনো অর্থ-বিত্তের।

দ্বিতীয়তঃ যার পিতাকে আমি হত্যা করেছি সে আমার কাছে এসে দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে পারবে কি না সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। আমি ভেবেছিলাম, দেখামাত্রই শাহজাদী আমাকে ঘৃণা করবেন। সেই সাথে আমি এও ভেবেছিলাম যে, কোনোদিন তিনি আমাকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসতে পারবেন না। তাই আমার মন চাইছিল না যে, এক অসহায় অবলা নারীকে এভাবে কষ্ট দেই।

সমবেত জনতা বিস্ময়ে বিভোর হয়ে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. এর কথা গুলো শুনছিল। মনে মনে বলছিল, মানুষ কি এতো মহৎ হতে পারে? পারে কি পরের সামান্য ভালোর জন্য নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দিতে? ইবনে যুবাইরের কথায় উপস্থিত জনতা যতটা না বিস্মিত হলো তাঁর চেয়ে বেশি বিস্মিত হলেন শাহজাদী। তিনি অবাক হয়ে অপলক নেত্রে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. এর চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আর ভাবতে লাগলেন, এ কি মানুষের কথা? তিনি কি কোনো মানুষ? না স্বর্গীয় ফেরেশতা? মানুষ কি এতো উদার হতে পারে? সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল তাঁর এই ভেবে যে, কত শত রাজপুত্র কত কেল্লাদার কত নেতা সর্দার—এক কথায় গোটা খৃষ্টান জগৎ যেখানে তাঁর জন্য পাগল ছিল, আজ তাঁকে হাতের মুঠোয় পেয়েও একজন মুসলিম সিপাহী তাঁর প্রতি সামান্য আকর্ষণ বোধ করেছে না। তিনি ভাবাবেগ বলে উঠলেন, আমি যা কিছু শুনলাম যারপরনাই বিস্মিত ও আশ্চর্য হলাম। আমার কাছে আরো আশ্চর্য লাগছে এই জন্য যে, হত্যাকারী না হয় আত্মগোপন করেছিল। কিন্তু এই হাজার হাজার মুসলিম সৈন্যদের থেকে একজন সৈন্যও মিথ্যাদাবী করতে এগিয়ে আসে নি। তাই আমি না বলে পারছি না যে, মুসলমানরা বাস্তবিকই ধর্মপরায়ণ ও মহৎ। এবং ইসলামই আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ধর্ম। যার আদর্শ শিক্ষায় মানুষ ফেরেশতারও ঊর্ধ্বে উঠতে পারে। তিনি আরো বললেন, জীবনে আমি কল্পনাও করিনি যে, ইসলামের প্রতি আমি আকৃষ্ট হবো। কিন্তু আজ সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা আমার হৃদয় কেড়ে নিয়েছেন। আমার অন্তরে ঢেকে দিয়েছেন ইসলামের আলো। আমার অনুরোধ, মেহেরবানী করে আপনারা আমাকে মুসলমান বানিয়ে নিন।

শাহজাদীর এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শুনে উপস্থিত সবাই আল্লাহু আকবার ধ্বনি তুলল। হযরত উসমান রাযি. সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে কালেমা পাঠ করিয়ে যথারীতি ইসলামে দীক্ষিত করে নিলেন। অতঃপর বললেন, মা! তোমাকে আরো একটি কথা জিজ্ঞেস করছি—ঠিক ঠিক করে বলতো মা! যদি তোমাকে এই নওজোয়ান ইবনে যুবাইরের হাতে তুলে দেই, তবে কি তুমি রাজী আছো? তোমাকে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই তুমি যদি তাঁকে স্বামী হিসেবে বরণ করে নিতে না চাও তবে আমরা তোমাকে মোটেই চাপ দিব না। স্বাধীনভাবে যাকে ইচ্ছা তাকেই তুমি স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে। শাহজাদী হেলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. দিকে সকৌতুহলে চেয়ে বললেন, আমি তাঁর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে সম্পূর্ণ রাজী। এতটুকু বলেই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন শাহজাদী। লজ্জায় তিনি সংকুচিত হয়ে পড়লেন। ভাবলেন, এত খোলাখুলি, এত নিঃসঙ্কোচে কি নিজের বিয়ের কথা আলোচনা করা যায়!

শাহজাদীর অনুমোদনক্রমে ইবনে যুবাইরের সাথে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন করা হলো। লক্ষাধিক টাকা মূল্যের যা কিছু রাজকীয় বেশ-ভূষা ও গহনা-অলঙ্কার ছিল এগুলো শাহজাদীকেই দেওয়া হলো। আর ঘোষিত একলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হলো ইবনে যুবাইর রাযি.কে। ইবনে যুবাইর তাঁর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে গৃহে ফিরলেন। তাঁর মা হযরত আসমা রাযি. সুন্দরী পুত্রবধূ পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। সেই সাথে আদায় করলেন মহান আল্লাহর দরবারে লাখো-কোটি শোকর। আজ যেন তাঁর ঘরে রূপ ও গুণের চাঁদ উদিত হলো।

সেদিন এই আফ্রিকী দুলাহানকে দেখবার জন্যে মদীনার সব বসয়ী ছেলে মেয়েরা ছুটে এলো এবং যেই তাঁকে দেখল, পঞ্চমুখী প্রশংসা না করে পারল না। সবার মুখে একই কথা, জীবনে এমন সুন্দরী আর দেখিনি। তিনি কি মানুষ, না বেহেশতের হুর!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *